ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬,  ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২০ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে বগুড়ার ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিতের প্রত্যয় তিন মন্ত্রীর আ.লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দাফন হয়েছে: সালাহউদ্দিন আহমদ মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা রবিবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন তারেক রহমান রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কেনায় ভারত-চীনের ওপর ১০০% শুল্কের মার্কিন বিল পাস রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কিনলেই ১০০% শুল্ক: মার্কিন সিনেটে বিল পাস ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সমাবেশে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন—সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৭:৪০ পিএম

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ট্রাইব্যুনাল এজলাসে কথা বলার অনুমতি না পাওয়ায় এবং পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যদের সাথে উচ্চবাচ্যের পর কাঠগড়া থেকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘বলতে চাচ্ছিলাম যে আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন।’ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক কাজ চলাকালীন এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। শুনানির সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বারবার কথা বলার চেষ্টা করলেও আদালত তাঁকে অনুমতি দেননি, বরং আইনজীবী মারফত কথা বলার ওপর জোর দেন। এ সময় কাঠগড়ায় থাকা মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ সদস্যদের সাথে সাবেক এই মন্ত্রীর উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা ঘটে। ট্রাইব্যুনালের এই অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক আখ্যা দিয়ে তিনি ক্ষোভের সাথে উচ্চবাচ্য করেন।

এদিকে ট্রাইব্যুনাল চত্বরে উপস্থিত তাঁর ছোট ভাই ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও আদালতের এই আচরণের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যদি কোনো অপরাধ না করেও তাঁর ৮৭ বছর বয়সী ভাইকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে তারা তা সাদরে গ্রহণ করবেন। শাপলা চত্বরের ঘটনার সাথে তাঁর ভাইয়ের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না দাবি করে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ অন্যায় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, আদালতের এমন ব্যবহারে তাঁরা ব্যথিত হলেও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই অন্যায়ের মোকাবেলা করবেন।

আজ সকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরবর্তীতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার শুনানি পরিচালনা করেন। বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে ট্রাইব্যুনাল লতিফ সিদ্দিকীকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। একই সাথে শুনানি শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন ট্রাইব্যুনাল।

শুনানি চলাকালীন একপর্যায়ে লতিফ সিদ্দিকীর আইনজীবী আদালতের কাছে আবেদন জানান যে, তাঁর মক্কেল ট্রাইব্যুনালের সামনে নিজের কিছু কথা ও বক্তব্য পেশ করতে চান। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিয়ম ও বিচারিক কাঠামোর কথা বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন সরাসরি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সরাসরি ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যোগ নেন। তিনি কাঠগড়ায় রাখা মাইক্রোফোনে হাত দিয়ে উঁচুকন্ঠে বলেন, ‘মহামান্য আদালত, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ লতিফ সিদ্দিকী কয়েকবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করতে থাকলে এজলাসে এক অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ট্রাইব্যুনালের সংক্ষুব্ধ বিচারক প্রশ্ন তোলেন, ‘কে কথা বলছে? তাঁকে কথা বলার জন্য কে অ্যালাউ করেছে? আজকের মতো এখানেই স্টপ।’ আদালতের এই কড়া বার্তার পর লতিফ সিদ্দিকী নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে উচ্চস্বরে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘হায়রে হায় হায়। এই যদি হয় আদালত, আমি কোথায় যাই?’

আদালতের নির্দেশের পর এজলাসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে লতিফ সিদ্দিকীর সামনে থেকে মাইক্রোফোনটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ সদস্যরা যখন তাঁকে নিরস্ত করতে যান এবং মাইক্রোফোনে কথা বলতে বাধা প্রদান করেন, ঠিক তখনই ট্রাইব্যুনালের এজলাসের অভ্যন্তরেই পুলিশ সদস্যদের সাথে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর তীব্র উচ্চবাচ্য শুরু হয়। তিনি ডিবির আচরণের প্রশংসা করে আদালতের কাঠগড়ার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন।

পরবর্তীতে শুনানির পুরো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা লতিফ সিদ্দিকীকে ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাঠগড়া থেকে বের করে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যেতে শুরু করেন। হাজতখানার পথে হাঁটার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্য থেকে একজন তাঁকে প্রশ্ন করেন, ট্রাইব্যুনালে আদালতের অনুমতি চেয়ে তিনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছিলেন? জবাবে লতিফ সিদ্দিকী অত্যন্ত হতাশা ও ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘বলতে চাচ্ছিলাম যে আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন।’

একই সময়ে লতিফ সিদ্দিকীর মামলার আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানি প্রত্যক্ষ করতে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছোট ভাই ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

সাংবাদিকরা কাদের সিদ্দিকীর কাছে জানতে চান, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাই লতিফ সিদ্দিকী আদালতে নিজেকে ফাঁসি দেওয়ার যে কথা বলেছেন, সে বিষয়ে তাঁর মন্তব্য কী? জবাবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মানুষ বাঁচে ক দিন? উনার ৮৭ বছর হয়ে গেছে। আমার ৮০ বছর হয়ে গেছে। এখন অপরাধটা লতিফ সিদ্দিকী করেননি, সে জন্য যদি তাঁর ফাঁসি হয়, সেটা তাঁরা সাদরে গ্রহণ করবেন। কারণ, আল্লাহ-তাআলা তাঁকে তখন মুক্তি দেবেন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন।’

শাপলা চত্বরের ঘটনার বিষয়ে ভাইয়ের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে কাদের সিদ্দিকী দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছিল, তার সাথে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কোনো ধরনের দূরতম সম্পর্কও ছিল না। তিনি বলেন, ‘এটা একেবারে অন্যায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তিনি স্পষ্ট জানান যে, রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যেই এই মামলা দেওয়া হয়ে থাক না কেন, তাঁরা আইনি পথেই এই ভিত্তিহীন মামলার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ লড়াই চালিয়ে যাবেন।

ট্রাইব্যুনাল এজলাসে লতিফ সিদ্দিকীর কথা বলতে চাওয়ার আকুতি এবং পরবর্তীতে পুলিশের সাথে উচ্চবাচ্যের ঘটনা প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির আদালতে কথা বলার অধিকার থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক অভিযুক্ত কথা বলতে পারেন। গত রাতে লতিফ সিদ্দিকীকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ডিবির সুন্দর ব্যবহার দেখেছেন। ট্রাইব্যুনালে সেটার বিপরীত, একেবারে অসুন্দর ব্যবহার। সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দেওয়া উচিত।’

আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার ও আদালতে হাজির করার সময় হাতে হাতকড়া পরানো প্রসঙ্গে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও নির্ভার কণ্ঠে কথা বলেন। বহু রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, লতিফ সিদ্দিকীর রাজনৈতিক জীবনে তাঁর হাতে হাতকড়া বহুবার পড়েছে। তাই নতুন করে হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো নিয়ে তাঁদের কোনো মানসিক কষ্ট বা আফসোস নেই। কাদের সিদ্দিকী মন্তব্য করে বলেন, ‘হ্যান্ডকাফ নিয়ে কোনো ব্যাপার নাই। এটা সরকার বুঝবে।’ পরিশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশে ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাঁর ভাই এই অন্যায় ও ভিত্তিহীন মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে বেকসুর খালাস পাবেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর