কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় তিতাস গ্যাসের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইনে ছিদ্র হয়ে প্রায় দুই মাস ধরে উচ্চচাপে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নির্গত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অবলীলায় অপচয় এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত লিকেজ বন্ধে দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী থেকে কিশোরগঞ্জ সদরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহকারী মূল পাইপলাইনটি কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীরচর এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদীর তলদেশ দিয়ে অতিক্রম করেছে। নদীর পাড়সংলগ্ন ঝোপঝাড়ের আড়ালে প্রায় এক বছর আগে একটি অবৈধ চুন তৈরির কারখানা গড়ে তোলে স্থানীয় একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, কারখানাটিতে অবৈধভাবে উচ্চচাপের গ্যাস সংযোগ নিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত মূল পাইপলাইনে ছিদ্র করে ফেলে চক্রটি। তবে সেই তীব্র চাপের গ্যাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তারা তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করে। এরপর থেকে ওই খোলা ছিদ্র দিয়েই অবিরাম গ্যাস বের হতে থাকে।
প্রথমদিকে এলাকাটি শুকনো থাকায় বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়। তবে সম্প্রতি বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে পাইপলাইনটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। এরপর পানির ওপর একটানা বিশাল বুদ্বুদ সৃষ্টি এবং পানির রং পরিবর্তন হতে দেখে স্থানীয়রা তিতাসের গ্যাস লিকেজের বিষয়টি নিশ্চিত হন। বর্তমানে প্রতিদিন কৌতূহলী মানুষ ওই স্থানে ভিড় করছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীপথে যাতায়াতকারী কোনো নৌযানের ইঞ্জিনের আগুন বা দিয়াশলাইয়ের স্পর্শে যেকোনো সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।
গ্যাস পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ফোরম্যান মো. রুহুল আমীন ও মো. মোমেন মিয়া জানান, অবৈধ সংযোগ নেওয়ার অপচেষ্টার ফলেই মূল লাইনে এই ছিদ্র তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা প্রায় ২০ দিন আগে খবর পেলেও টানা বৃষ্টি, নদীতে তীব্র স্রোত এবং ক্রেনসহ ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর সড়ক না থাকায় তাৎক্ষণিক মেরামত করা সম্ভব হয়নি। নদী ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত লিকেজ মেরামতের কাজ শুরু হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রবিন মিয়া ও মাহফুজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দেশের এক প্রান্তে যখন চরম গ্যাসসংকট চলছে, তখন কটিয়াদীতে দুই মাস ধরে কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ নদীতে ভেসে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এমন দুঃসাহস সম্ভব নয়। অনতিবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও পাইপলাইন মেরামত নিশ্চিত করতে হবে।"
তবে অভিযুক্ত চুন কারখানার মালিক বা তাঁদের সহযোগীদের পাওয়া না যাওয়ায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের নরসিংদী সেলস অফিসের ম্যানেজার ফজলুল হক জানান, একটি সুসংগঠিত চক্র এলাকাটিতে অবৈধ চুন কারখানা বানিয়ে গ্যাস চুরির ফাঁদ পাতছে। ইতোমধ্যে নরসিংদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কয়েকটি কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কটিয়াদীর এই বিপজ্জনক স্পটটির বিষয়ে জরুরি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জরুরি ভিত্তিতে পাইপলাইনের লিকেজ মেরামত, গ্যাস চুরির অপচেষ্টায় জড়িত মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোর দাবি জানিয়েছেন কটিয়াদীবাসী।