আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্যেই তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে চলেছে সড়ক সংস্কারকাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থ লোপাট করতেই বারবার বৃষ্টির মধ্যে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এভাবে খানাখন্দ ঢাকার নাটক সাজাচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে সওজ-এর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ চালক ও পথচারীরা।
আলিফ পরিবহনের বাসচালক মোঃ বেল্লাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ৭১ কিলোমিটার মহাসড়কের পটুয়াখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে মহিষকাটা পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার অংশের সংস্কারকাজ গত জুন মাসে শেষ হয়। কাজ শেষের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় পুরো সড়কে অসংখ্য খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। ওই ভাঙাচোরা অংশ ১৫ দিন আগে সওজ বিভাগ আবার মেরামত করে। কিন্তু সেই মেরামতের ১০ দিন যেতে না যেতেই সড়কটি পুনরায় বিপজ্জনক খানাখন্দে পরিণত হয়। এখন আবার বৃষ্টির মধ্যেই ভেজা রাস্তায় পিচ-পাথর ফেলে তড়িঘড়ি করে কাজ করছে তারা। এটা মূলত সরকারি অর্থ আত্মসাটের অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা জোনের আওতাধীন। ২০০০ সালে নির্মিত এই মহাসড়কে শুরু থেকেই অনিয়ম হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ধরে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কিছু অংশে সাময়িক সংস্কার করা হলেও তা টেকসই হয়নি।
পটুয়াখালী সেতুর টোল প্লাজার তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দূরপাল্লার বাস, লোকাল বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাসসহ অন্তত ৯১২টি ভারী যানবাহন যাতায়াত করে। এছাড়া প্রতিদিন সহস্রাধিক থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও এই রুট ব্যবহার করে। মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়।
এমতাবস্থায় চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতে পটুয়াখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে মহিষকাটা পর্যন্ত প্রায় ১৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের উদ্যোগ নেয় পটুয়াখালী সওজ। ১৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে গত ৩০ জুন এই সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়। তবে হস্তান্তরের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে পিচ-পাথর উঠে গিয়ে শত শত গর্ত তৈরি হয়। গণমাধ্যমে এ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সওজ কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে তা জোড়াতালি দেয়। কিন্তু ১০ দিনের ব্যবধানে তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। গত শনিবার পটুয়াখালী সওজ বিভাগের লোকজন মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্য ভিজে সেই খানাখন্দ পুনরায় মেরামত করতে নামেন।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, শাখারিয়া থেকে মহিষকাটা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে এবং পিচ উঠে গিয়ে ইটের খোয়া বেরিয়ে এসেছে। এর মাঝেই ভিজা রাস্তায় সওজ-এর শ্রমিকেরা মেরামতকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, "স্যারেরা আমাগো যেমনে কাজ করতে বলছেন, আমরা এমনেই করতেছি। তাঁদের নির্দেশের বাইরে তো আর আমরা কিছু করতে পারি না।"
স্থানীয় বাসিন্দা মিথুন কর্মকার বলেন, "নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও দায়সারাভাবে কাজ করায় বার বার রাস্তা ধসে যাচ্ছে। এভাবে জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ মেনে নেওয়া যায় না।" যাত্রী নাজমুল আহসান ও রাশেমুল হাওলাদার জানান, ১০ দিনের মাথায় যদি একই জায়গায় বারবার সংস্কার লাগে, তবে প্রথমবার কোটি কোটি টাকা খরচ করে কী কাজ করা হলো? বিষয়টি উচ্চপর্যায় থেকে তদন্ত করা দরকার।
বৃষ্টির মধ্যে হাঁটু পানিতে সংস্কারকাজ করার কথা স্বীকার করে পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, "ছোট থাকতেই খানাখন্দগুলো বন্ধ করে দিতে হয়, তা না হলে গর্ত আরও বড় হয়ে যাবে। তাই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কাজ করতে হচ্ছে।" বৃষ্টির ভেজা রাস্তায় এই বিটুমিন ও পিচ আদৌ টিকবে কি না—এমন প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, "কিছু করার নেই, এটি সরকারের একটি চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া।"