সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 105
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জে ড্রাগন চাষ বদলে যাচ্ছে কৃষির চিত্র। এক সময় যেখানে কৃষকরা মূলত ধান, পাট, ভুট্টা ও সবজি চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, সেখানে এখন লাভজনক ফল হিসেবে ড্রাগন চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষের দ্রুত সম্প্রসারণ কৃষিতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি বিভাগের পরামর্শ, বাজারে উচ্চমূল্য এবং তুলনামূলক কম পরিচর্যার কারণে দিন দিন কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই বিদেশি ফল।
চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো পরিচর্যা এবং রোগবালাই কম থাকায় সিরাজগঞ্জে ড্রাগনের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করছেন। এতে জেলার অনেক কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধাপে ধাপে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সদর, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, কাজিপুর, তাড়াশ, বেলকুচি, শাহজাদপুর, কামারখন্দ ও চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে শত শত কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগনের বাগান গড়ে তুলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দোআঁশ, বেলে-দোআঁশ ও উঁচু জমি ড্রাগন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সাধারণত ডিসেম্বর মাসে চারা রোপণ করা হলেও বর্তমানে উন্নত হাইব্রিড জাতের কারণে প্রায় সারা বছরই চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত বাউ-১, বাউ-২ ও বাউ-৩ জাতের মধ্যে বাউ-৩ বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ফলের আকার, রং, স্বাদ ও বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় কৃষকেরা এই জাতের প্রতিই বেশি ঝুঁকছেন। ড্রাগন চাষের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে সিমেন্টের খুঁটি স্থাপন করে জিআই তারের মাধ্যমে শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রতিটি খুঁটির চারদিকে চারটি করে চারা লাগানো হয়। নিয়মিত সেচ, জৈব সার, আগাছা পরিষ্কার ও ছাঁটাই করলে মাত্র ছয় থেকে আট মাসের মধ্যেই গাছে ফুল আসে। একটি গাছ থেকে টানা ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের জন্য লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রক্ষ্মখোলা গ্রামের সফল কৃষক ও উদ্যোক্তা এস. এম. ইদ্রিস আলী জানান, ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন চাষ শুরু করেন তিনি। প্রথমদিকে অভিজ্ঞতার অভাবে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়লেও কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সফলতা আসে।
তিনি বলেন, এ বছর আমার প্রায় আড়াই বিঘা জমির বাগানে আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় দেড় টন ফল বিক্রি করেছি। আরও সাত থেকে আট টন ফল পাওয়ার আশা করছি। স্থানীয় পাইকাররা প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনছেন। খুচরা বাজারে একই ফল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বিঘায় প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ড্রাগনের সাদা সুগন্ধি ফুল ফোটার সময় পুরো বাগান মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। বিকেল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসেন। অনেকেই ছবি তোলেন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ফলে কৃষির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, খাদ্যআঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে ফলটির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এখন নিয়মিত ড্রাগন সরবরাহ করা হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন আড়ত ও ফল ব্যবসায়ীরা জানান, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় বাইরে থেকে ড্রাগন আনার প্রয়োজন কমেছে। একই সঙ্গে সিরাজগঞ্জের ড্রাগন এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর ও সিলেটের বাজারেও যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বিদেশে রপ্তানিরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
ড্রাগন চাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের সহায়তা করছে। এতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এবং শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, এবার ড্রাগনের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন আবাদ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আধুনিক চাষাবাদ ও উন্নত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম ড্রাগন উৎপাদনকারী জেলায় পরিণত হবে।কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কম পানির প্রয়োজন হয় এবং তুলনামূলক কম রোগবালাই হয়—এমন ফলের চাষ বাড়ানো সময়ের দাবি।
সেই বিবেচনায় ড্রাগন হতে পারে সিরাজগঞ্জের কৃষকদের জন্য একটি টেকসই ও লাভজনক বিকল্প। সরকারি সহায়তা, সহজ কৃষিঋণ, আধুনিক সংরক্ষণাগার, মানসম্মত চারা উৎপাদন এবং রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ড্রাগন চাষ শুধু কৃষকের ভাগ্যই বদলাবে না, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।