সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত ১০ তলাবিশিষ্ট ব্লিস হাসপাতালে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে হঠাৎ লাগা এই আগুনে সৃষ্ট প্রচণ্ড ও তীব্র ধোঁয়া এবং জীবন বাঁচাতে রোগী-স্বজনদের হুড়োহুড়িতে ফায়ার সার্ভিসের সাহসী কর্মীসহ অন্তত ৫০ জন রোগী ও তাদের স্বজনেরা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশের তাৎক্ষণিক দ্রুত সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতার ফলে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় সূত্র ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ১০ তলাবিশিষ্ট ওই ভবনটির বেসমেন্ট বা পার্কিং ফ্লোর থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিষাক্ত আগুনের কালো ধোঁয়া পুরো ১০ তলা ভবনে ছড়িয়ে পড়লে নিমিষেই ভেতর থাকা ভর্তি রোগী, চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয় এবং আত্মরক্ষার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, বহুতল ভবনের পার্কিং ফ্লোরে থাকা কোনো গাড়ি বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কিংবা বেসমেন্টে সংরক্ষিত অক্সিজেন সিলিন্ডারের লিকেজ থেকেই মূলত এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট কাজ শুরু করে। তবে ভবনে জমানো ধোঁয়া ও আগুনের তীব্রতা বেশি বিবেচনায় পরবর্তীতে আশপাশের এলাকা থেকে আরও ৪টি অতিরিক্ত ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে যুক্ত হয়। ফলে ফায়ার সার্ভিসের মোট ৬টি ইউনিট একযোগে জীবন বাজি রেখে কাজ চালায়। পরবর্তীতে প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের আপ্রাণ ও নিরলস প্রচেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীরা।
তবে পুরো বহুতল ভবনটিতে প্রকাণ্ড ধোঁয়া জমে থাকার কারণে বিষাক্ত ধোঁয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ অনেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ সহায়তায় ভবনের ভেতরে আটকে থাকা নারী, শিশু ও বয়স্ক বহু সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত ও সফলতার সঙ্গে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়। ভয়াবহ ধোঁয়ায় মারাত্মক অসুস্থ ও আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও হার্ট ফাউন্ডেশনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে দ্রুত ভর্তি করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঘটনার পরপরই নিরাপত্তার স্বার্থে এবং উদ্ধার কাজের সুবিধার্থে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলের চারপাশে আহত ও অসুস্থ রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নিতে অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, মহাসড়ক সামলানো ও উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দিতে সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশ, বিজিবি ও ট্রাফিক বিভাগের শতাধিক দায়িত্বশীল সদস্য একযোগে নিরলস কাজ করেন।
হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস বলেন, "নিচতলায় আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দ্রুত রোগীদের সরিয়ে অন্যত্র নিরাপদে নেওয়ার সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পরে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা এসে যৌথভাবে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।"
সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক সাইফুজ্জামান জানান, ৬টি ইউনিটের যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক নেপথ্য কারণ ও মোট ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুর রহমান জানান, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং ভবনের ভেতরে আটকে থাকা সবাইকে সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যাদের বর্তমানে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা টুডে / আরজে