ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

“জামদানি তো শুধু শাড়ি নয়, জীবনের গল্প গাথাও

জামদানি বুনে যে নারী, পড়ে না সে শাড়ি!


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৬:৩২ পিএম

শফিকুলআলম ভুঁইয়া রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ

কথায় বলে শাড়িতেই নারী, আর তা যদি হয় জামদানি, তবে তো মজেছেন নারী। প্রতিটি নারীরই শখ জীবনে একবার হলেও জামদানি শাড়ি পরার। জামদানি শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক। সূক্ষ্ম নকশা, মসৃণ বুনন এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য এই শাড়ির কদর সবসময়ই বেশি। সুতার মান ও কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে একটি জামদানি শাড়ির দাম সাধারণত আড়াই হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে।


ইতিহাস বলে, হাওয়ার মতো ফুরফুরে আর জলের মতো স্বচ্ছ এই শাড়ির জন্ম মোগল আমলে। জামদানি খাঁটি হ্যান্ডলুম এবং এর বুননে তাঁতের টানা-পড়েনে সত্যিই দারুণ মুনশিয়ানা লাগে। তাঁতে বসেই পড়েনে অর্থাৎ আড়ের দিকের বুনটে তৃতীয় একটি সুতোয় হাতে নকশা তুলতে হয়, আগে থেকে আঁকার কোনো ব্যাপারই নেই। এর বেশিভাগটাই ফ্লোরাল এবং জ্যামিতিক মোটিফ।


দক্ষতা এবং সময়—দুই-ই জরুরি হাতে বোনা এই অত্যাশ্চর্য বুনন পদ্ধতিতে। ইউনেস্কো ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’ আখ্যায় ভূষিত করেছে এই জামদানি বুননকে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও তা আজ স্বীকৃত। বুটিদার, তেরছা, ঝালর... নানা নাম, নানা ডিজাইন জামদানি ক্যানভাসে, মসলিন এবং সুতিতে।


“জামদানি তো শুধু শাড়ি না গো বাজান, এতে মিশে আছে আমাগো জীবনের গল্পকাহিনী। অভাবের তাড়নায় লাখ টাকার শাড়ি বুনলেও পরার ভাগ্য আমাগো হয় না। পেটের খোরাকই জোগাড় করতে পারি না, আবার শখের জামদানি পরুম কেমনে? জামদানি বুনে যা পাই তা দিয়ে কোনো রকমে সংসারের খরচ চালাই। মাস শেষে ঋণ হয়ে যাই।” কথাগুলো বিষণ্ণ কণ্ঠে বলছিলেন রূপগঞ্জের জামদানি কারিগর আলেয়া বেগম। রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীর হাজারো নারী প্রতিনিয়ত অভাবের তাড়নায় পরতে পারেন না বিলাসবহুল, বহুকাঙ্ক্ষিত এই জামদানি শাড়ি। আছিয়া নামের অপর এক কারিগর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “জামদানি বুনে যে নারী, পরতে পারে না সে শাড়ি। জামদানের প্রতি পরতে পরতে (ভাঁজে ভাঁজে) রয়েছে আমাগো জীবনের দুঃখগাথা ও গল্পকাহিনী।”


রূপসী গ্রামের এক সাধারণ নারী মাসুদার জীবনের গল্প যেন জামদানি শাড়ির মতোই সূক্ষ্ম আর আবেগে ভরা। প্রায় ১১ বছর ধরে স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে তিনি জামদানি শাড়ি বুনেছেন। নিজের হাতের নিখুঁত কারুকাজে তৈরি অসংখ্য শাড়ি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু জীবনের প্রায় ৬০ বছর পার হলেও নিজের তৈরি একটি জামদানি শাড়ি পরার সুযোগ তাঁর হয়নি। সংসারের চরম অভাব-অনটনের কারণে তৈরি করা প্রতিটি শাড়িই বিক্রি করে দিতে হতো।


সম্প্রতি ছেলের দেওয়া একটি জামদানি শাড়ি পরে মাসুদা বেগম বলেন, তিনি আজ খুব খুশি। শাড়িটি তাঁর খুব পছন্দ হয়েছে। এটি তিনি এত যত্ন করে রাখবেন যে সহজে পরবেনই না। আবেগপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘অনেক খুশি হইছি। এই শাড়ি আলগা (খুব যত্ন করে) করে পরন লাগব। পানিও লাগান যাইব না। আলমারিতে তুইল্যা রাখমু। আবার কোনো বড় অনুষ্ঠান হইলে পরমু।’


মাসুদা বেগমের জীবনভর তাঁত বুননের কাহিনী দীর্ঘ কষ্ট আর ত্যাগের সঙ্গে জড়িত। মাত্র ২৩ বছর বয়সে স্বামীর কাছ থেকে পুটি বোনা শিখেছিলেন তিনি। ভাতের অভাবে বাধ্য হয়ে তিনি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পুটিতে বসে শাড়ি বুনেছেন, কখনো নিজের ছোট সন্তানদের কোলে নিয়ে, কখনোবা তাদেরই পুটিতে বসিয়ে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “পোলাপানকে লেখাপড়া শেখাতে পারিনি, শুধু বুনেছি।”


এ প্রসঙ্গে এলাকার বয়োবৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম বলেন, আধুনিকতার এই যুগে জামদানি শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। হাজারো সমস্যার সমাধান করে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। বাংলার বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্য মসলিনের আধুনিক রূপান্তর জামদানিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “জামদানি শুধু একটি শাড়ির নাম নয়, এটি বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সরকার দেশীয় এই শিল্পকে রক্ষা এবং কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।”


এ সম্পর্কিত আরো খবর