ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ও রংপুরের গণজাগরণে তরান্বিত হাসিনার পতন


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৪:০৪ পিএম

জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে বীর শহীদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্যই মূলত স্বৈরাচারী শাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে পুলিশের বুলেটের সামনে দু’হাত প্রসারিত করা ওই ছাত্রের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ রংপুর তথা পুরো দেশের ছাত্র-জনতাকে অদম্য এক গণআন্দোলনে একতাবদ্ধ করে। সেই থেকে রাজপথে গড়ে ওঠা বাঁধভাঙা প্রতিরোধ সময়ের সাথে সাথে পরিণত হয় এক অপ্রতিরোধ্য গণঅভ্যুত্থানে, যার অমোঘ পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার।


আবু সাঈদের আত্মদানের পর থেকেই রংপুরে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। পরবর্তী সময়ে ৩ আগস্ট বৃষ্টিভেজা দিনে রংপুরের রাজপথে নামে সাধারণ মানুষের অভাবনীয় জনস্রোত। ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষের এই ঐতিহাসিক উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেষ্টনী কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকার পতনের এক দফা দাবির মুখে আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছিল, তখন স্থানীয় প্রশাসন ও শাসকদলের সশস্ত্র সদস্যরা তা স্তব্ধ করতে মরিয়া চেষ্টা চালায়।


৪ আগস্ট পতনের ঠিক আগের দিনটিতে রংপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অস্ত্রধারী নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালালে পুরো নগরী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সিটি বাজার, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও টাউন হল এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষে সংবাদকর্মীসহ বহু মানুষ আহত হন। প্রবল প্রতিবাদের মুখে দখল হারিয়ে প্রাণ হারান ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কাউন্সিলর হারাধন রায়সহ পাঁচ নেতাকর্মী। সংঘাতের এই উত্তাপ ছড়ায় গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জের মতো দূরবর্তী উপজেলাগুলোতেও।


অগ্নিগর্ভ সেই আন্দোলন চলাকালে ১৬ থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে রংপুরে নির্মম বলপ্রয়োগের শিকার হয়ে আরও বহু প্রাণ ঝরে যায়। ১৮ জুলাই মডার্ন মোড়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া। এরপরের দিন ১৯ জুলাই বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকা। সেখানে গুলিতে জীবন দেন সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম এবং বিজিএসসি-র শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ-আল তাহির। শত শত মানুষ গুলিবিদ্ধ হন, চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন অনেকে।


তবে আন্দোলন সফল হলেও দুই বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু বিচারহীনতার অবসান ঘটেনি বলে অভিযোগ স্বজন ও আন্দোলনকারীদের। সংঘটিত ছয়টি নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতা সহ হাজারো মানুষকে আসামি করে মামলা হলেও একটিরও অভিযোগপত্র বা চার্জশিট আদালতে দাখিল করেনি সিআইডি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। এমনকি মূল গুলি চালানো অস্ত্রধারীদেরও চিহ্নিত কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়নি। উপরন্তু মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ ও আসামিদের নাম কাটানোর চেষ্টা নিহতদের পরিবারকে চরম হতাশায় ফেলেছে।


নিহত সাজ্জাদ হোসেনের মাতা ময়না বেগম এবং মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন গভীর আকুতি জানিয়ে গণহত্যার প্রকৃত বিচারের দাবি তুলেছেন। তারা বলেন, সরকারি সহায়তা মিললেও স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার শ্লথগতি তাদের প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দিচ্ছে। সমন্বয়ক ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, হুকুমদাতা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ গুলি চালানো পুলিশ সদস্যদের রেহাই দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা অবশ্য দ্রুততম সময়ে লিখিত অনুমোদনসাপেক্ষে আদালতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।


অবশেষে ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পলায়নের খবর পৌঁছালে দীর্ঘদিনের শৃঙ্খলমুক্তির আনন্দে মেতে ওঠে রংপুরবাসী। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের জাতীয় পতাকা হাতে রাজপথে বিজয় উল্লাস, মিষ্টি বিতরণ ও শুকরিয়া আদায় দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটায়। রংপুর জিলা স্কুল মোড়, শহীদ আবু সাঈদ চত্বর ও জাহাজ কোম্পানি মোড় সহ পুরো রংপুর সেদিন ছাত্র-জনতার জয়ে মুখরিত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে জনরোষের সামনে কোনো দুঃশাসনই টিকতে পারে না।


এ সম্পর্কিত আরো খবর