ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

জেলা প্রশাসকের কঠোর পদক্ষেপে স্বস্তি

কাশিমপুরের পর গাজীপুরের সব ভূমি অফিসে অভিযানের দাবি

স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৬:০৭ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান,  বিশেষ প্রতিনিধি

গাজীপুরের কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানের পর জেলার অন্যান্য ভূমি অফিসেও একই ধরনের অভিযান পরিচালনার দাবি জোরালো হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুল করিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে দুর্নীতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সচেতন নাগরিক, সেবাগ্রহীতা ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভূমি প্রশাসনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাশিমপুর ভূমি অফিসে পরিচালিত অভিযান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম উন্মোচন করেনি; বরং এটি দেখিয়েছে যে প্রশাসনিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অভিযান

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাশিমপুর ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে নামজারি, খারিজ, খাজনা আদায়সহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, অযথা ফাইল আটকে রাখা এবং সেবা প্রদানে বিলম্বের মতো অভিযোগও ছিল।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের সরাসরি অভিযানে অনিয়মের বিভিন্ন দিক সামনে আসে। অভিযানের পর দুর্নীতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। অনেকেই এই পদক্ষেপকে ভূমি প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

ভূমি সেবায় দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো

ভূমি সংক্রান্ত সেবা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি ক্রয়-বিক্রয়ের পর নামজারি, খারিজ, খাজনা পরিশোধসহ বিভিন্ন কাজে নাগরিকদের ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে যেতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এসব সেবা পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এবং নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না করে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক ভোগান্তিতেও পড়েন।

আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন

বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুর জেলার একাধিক ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণ তাদের সরকারি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একজন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার মাসিক বেতন প্রায় ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে একাধিক প্লট, রাজধানীতে বাড়ি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে কিছু দপ্তরি ও পিয়নের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাসে লক্ষাধিক টাকা অবৈধভাবে আয় করছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকারি তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সব ভূমি অফিসে অভিযানের দাবি

সম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়ার প্রতি জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। তারা কাশিমপুরের মতো জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পর্যায়ক্রমে আকস্মিক অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।

সচেতন মহলের মতে, একটি বা দুটি অফিসে অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জেলার সব ভূমি অফিসে সমানভাবে নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। এতে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্নীতির সুযোগও অনেকাংশে কমে আসবে।

তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান

দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন মহল নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, প্রতিটি ভূমি অফিসে নিষ্পত্তিকৃত ফাইল, সেবা প্রদানের সময়সীমা, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।

একই সঙ্গে অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

গাজীপুরের চিত্র কি সারাদেশের প্রতিচ্ছবি?

পর্যবেক্ষকদের মতে, গাজীপুরের পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য জেলার ভূমি অফিসগুলোর বাস্তব চিত্রের সঙ্গে অনেকাংশেই মিল রয়েছে। কোথাও অনিয়মের মাত্রা কম, কোথাও বেশি হলেও ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

তাদের মতে, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, নিয়মিত অডিট, আকস্মিক পরিদর্শন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভূমি প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

স্বচ্ছ ভূমি প্রশাসনের প্রত্যাশা

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাশিমপুর ভূমি অফিসে পরিচালিত অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—প্রশাসন চাইলে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গাজীপুর জেলার প্রতিটি ভূমি অফিসে পর্যায়ক্রমে অভিযান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা শুধু গাজীপুর নয়, সারাদেশের ভূমি প্রশাসনের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।     

গাজীপুরের কাশিমপুর ভূমি অফিসে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া-এর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযান জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূমি সেবা নিয়ে মানুষের যে অসন্তোষ ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল, সেই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের এই দৃঢ় পদক্ষেপকে গাজীপুরবাসী সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনসেবামুখী প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কাশিমপুরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম শুধু একটি অফিসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জেলার প্রতিটি ভূমি অফিসে একইভাবে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর তদারকি অব্যাহত থাকবে।

গাজীপুরবাসীর বিশ্বাস, সৎ, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসনিক নেতৃত্ব দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে সেবার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যারা আইন ও বিধি মেনে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অনুপ্রেরণার; আর যারা অনিয়মে জড়িত, তাদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

গাজীপুরের মানুষ আশা করেন, জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও একই দৃঢ়তায় চলমান থাকবে। তাঁর এই জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক অবদান রাখবে এবং জেলার উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর এই জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের টনক নাড়িয়ে দিয়েছেন। 


এ সম্পর্কিত আরো খবর