ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,  ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু এইচএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন শুরু ১ নভেম্বর কাল প্রকাশ হবে এইচএসসি রেজাল্ট, অনলাইনে জানবেন যেভাবে শনিবার বিক্ষোভ সামাল দিতে প্রস্তুত ফ্রান্সের ৭০ হাজার পুলিশ ভারতে ছয় আরোহীসহ হেলিকপ্টার নিখোঁজ, বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা ঝুলে গেল ইসরায়েলের নির্বাচন: রাজনৈতিক সংকটের আড়ালে হাসছেন নেতানিয়াহু তাহসিফ হত্যা রহস্য: দীপের এলোমেলো বক্তব্যে ঘনীভূত হচ্ছে ধোঁয়াশা কলাবাগানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজনকে আটক করল পুলিশ সাইকেলে ১৯১ দেশ ভ্রমণ: সোমেন দেবনাথের অনন্য কীর্তি নম্বরপ্লেটবিহীন বাইক উদ্ধার ও দীপের তথ্যে তাহসিফ মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড়

অনিশ্চয়তায় প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সফর

হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন ও গভীর সংকট


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৮ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:৪৩ এএম

নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সরাসরি গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে মতবিনিময় এবং সেখান থেকে দেশে ফিরে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণা ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে তীব্র টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কৌশলগত ও স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, ভারতের মাটিতে বসে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার এই আয়োজন সেই প্রচেষ্টায় এক মস্ত বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনাকে এই ধরণের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রেস ব্রিফিংয়ের সুযোগ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার কেবল গভীর ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদই ব্যক্ত করেনি, বরং নয়াদিল্লির এই অবস্থানকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

পররাষ্ট্র কূটনীতি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রকাশ পায় যে, দিল্লিতে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অন্তত দুই দিন আগেই বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পক্ষ থেকে ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের কাছে এই বিষয়ে আগাম গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। জবাবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছিল যে, কোনো সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করা হবে না; কেবল একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আয়োজক সংগঠনের উপস্থিতিতে রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লি সেই প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, যা ঢাকার নীতিনির্ধারণী মহলে চরম আস্থার সংকট তৈরি করেছে। অথচ এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিকে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিল যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শেখ হাসিনাকে কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত হতে শুরু করলে কূটনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ বার্তা সামনে আসে। মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সরকারি ব্রিফিংয়ে জানান যে, দিল্লির সংবাদ সম্মেলন বা প্ল্যাটফর্ম থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বৈধভাবে গঠিত তারেক রহমান সরকারের বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে, ভারত সরকার তা কোনোভাবেই সমর্থন বা অনুমোদন করে না। কিন্তু এর পরও নয়াদিল্লির এই 'দ্বিমুখী অবস্থান' ঢাকা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য হিসেবেই বিবেচনা করছে, যা চলমান বহুপক্ষীয় আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আসন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক আসরগুলোতে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের বিশেষ আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। সম্মেলনটির মাধ্যমে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের এক অনন্য সুযোগ উন্মোচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে বসে শেখ হাসিনার অব্যাহত রাজনৈতিক তৎপরা বন্ধে নয়াদিল্লির দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়টি এখন মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে গিয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও শীর্ষ বিশ্লেষকরা ভারতের এই বিতর্কিত ভূমিকার কড়া সমালোচনা করছেন। মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভারত চাইলেই এই বহুল আলোচিত সংবাদ সম্মেলনটি বন্ধ করতে পারত; ফলে ঢাকা স্বভাবতই এটিকে হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির পক্ষপাতমূলক প্রশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করবে। এমনকি ভারতের নিজস্ব গণমাধ্যম 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' তাদের বিশেষ সম্পাদকীয়তে সতর্ক করে লিখেছে যে, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চ প্রদান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাদের মতে, কোনো একক ব্যক্তি বা বিশেষ স্বার্থের কাছে দুটি প্রতিবেশীর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে জিম্মি রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

একই সুর ফুটে উঠেছে বিবিসি বাংলার বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনেও, যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, নিজের একগুঁয়ে রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনা এখন ভারতের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির জন্যই বড় ধরণের 'অস্বস্তির বোঝা' হয়ে দাঁড়িয়েছেন কি না। কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, দুই প্রতিবেশীর স্বাভাবিক সম্পর্কের স্বার্থেই নয়াদিল্লির উচিত শেখ হাসিনার এই ধরণের রাজনৈতিক চর্চা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস রুখে দিয়ে কীভাবে আস্থার সংকট কাটানো যায়, এখন সেই দায়িত্ব ভারতকেই নিতে হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর