বাংলাদেশের সহ-অধিনায়ক ও অফ-স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজের ধারালো স্পিন ঘূর্ণিতে পুরোপুরি নাজেহাল হয়ে পড়েছিল স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। ম্যাচের চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনের শুরুতেই দ্রুত ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে যায় অজিরা। তবে প্রতিপক্ষের এমন ভয়াবহ স্পিন আক্রমণের মুখেও একপ্রান্ত আগলে রেখে বাংলাদেশের বোলারদের বিরুদ্ধে একাই বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ক্যামেরন গ্রিন। তাঁর দায়িত্বশীল ও অপরাজিত হাফ সেঞ্চুরির ওপর ভর করে শেষ পর্যন্ত ১৫ রানের লিড বাগিয়ে নিয়ে লাঞ্চ বিরতিতে যেতে সমর্থ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। মধ্যাহ্নভোজের বিরতি পর্যন্ত গ্রিন ৮৫ রানে এবং মিচেল স্টার্ক ১৪ রানে ক্রিজে অপরাজিত ছিলেন।
রোববার খেলার প্রথম দেড় ঘণ্টায় ডারউইনের পিচে স্পিন জাদু দেখান মিরাজ। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার ক্যামেরন গ্রিন একপ্রান্ত ধরে রাখলেও অপর প্রান্তে আসা অ্যালেক্স ক্যারি, বেউ ওয়েবস্টার ও অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে একে একে সাজঘরের পথ দেখান তিনি। এই বাংলাদেশি অফ-স্পিনারের চোখধাঁধানো বোলিং নৈপুণ্যে একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ খুব দ্রুতই অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। তবে সপ্তম উইকেটের পতনের পর গ্রিন ও মিচেল স্টার্কের দায়িত্বশীল জুটিতে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে অগ্রগামিতা ও লিড অর্জন করে স্বাগতিকরা। রোববার প্রথম সেশন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ২৪৩ রান।
এর আগে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল অজিরা। দিনের সপ্তম ওভারেই তারা নিজেদের পঞ্চম উইকেটটি হারায়। উইকেটরক্ষক ব্যাটার অ্যালেক্স ক্যারিকে ফিরিয়ে গ্রিনের সঙ্গে গড়ে ওঠা ৫৬ রানের প্রতিরোধ গড়া জুটি ভেঙে দেন মিরাজ। আউট হওয়ার আগে ক্যারি ৭২ বলে ৩০ রান করে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ তুলে দেন।
দীর্ঘ ১৩ মাস পর এবং টানা ১৩টি টেস্ট ইনিংসে প্রথম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে অপরাজিত থাকা গ্রিনের সঙ্গে অবশ্য বেশি সময় উইকেটে টিকে থাকতে পারেননি তরুণ ব্যাটার বেউ ওয়েবস্টার। মিরাজ তাঁকে মাত্র ৫ রানে দুর্দান্ত এক স্পিন ডেলিভারিতে বোল্ড করে সাজঘরে ফেরত পাঠান। এরপর ১০৯ বলে ২ চারের সাহায্যে নিজের ফিফটি পূর্ণ করা গ্রিনকে সাহায্য করতে উইকেটে আসেন অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। তবে কামিন্সও বাংলাদেশি বোলিং আক্রমণের সামনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি; মাত্র ৮ রান করে তিনি সাদমান ইসলামের তালুবন্দি হন। তাকে আউট করে নিজের বোলিং স্পেল আরও শক্ত করেন মিরাজ। দিনের খেলা শুরু হওয়ার পর এটি ছিল মিরাজের তৃতীয় এবং এই ইনিংসে চতুর্থ সাফল্য। এর ফলে ২০৭ রানের মাথায় সপ্তম উইকেট হারিয়ে ফেলে চরম বিপদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
পরবর্তী সময়ে অভিজ্ঞ মিচেল স্টার্ক ও দায়িত্বশীল ক্যামেরন গ্রিনের মধ্যকার দৃঢ় জুটিতে ইনিংসের ৭৯তম ওভারের শেষ বলে বাংলাদেশের রানের সমতায় পৌঁছে যায় স্বাগতিক দল। এর পর আরও দুই বল খেলে আনুষ্ঠানিকভাবে লিড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। গ্রিন একটি সিঙ্গেল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে ৭ উইকেটে ২২৯ রান এনে দিয়ে দলীয় লিড নিশ্চিত করেন।
প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসের মতো পুরোপুরি ভরাডুবি দেখেনি স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ প্রায় দুটি সেশনে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে দুর্দান্ত এক মানসিক চাপ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল। তবে ম্যাচের তৃতীয় দিনের শেষ সেশনে স্বাগতিক ব্যাটাররা দারুণ শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। প্রথম ইনিংসের ব্যবধান থেকে মাত্র ৬৭ রানে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করে তারা নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং লড়াইয়ের মানসিকতা ফিরিয়ে আনছিল।
ম্যাচের প্রথম ইনিংসে অজিদের তোলা ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রানের এক বিশাল পাহাড়সম স্কোর গড়ে তোলে। ওপেনিং ব্যাটার তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর চোখধাঁধানো হাফ সেঞ্চুরি এবং শেষ দিকে মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর ফিফটিতে ভর করে টাইগাররা অত্যন্ত মজবুত অবস্থানে থেকে তাদের প্রথম ইনিংসের খেলা শেষ করে। গত শনিবার ম্যাচের তৃতীয় দিনে লাঞ্চের বিরতির পরপরই অলআউট হয় সফরকারী বাংলাদেশ। হাতে চার উইকেট রেখে দিনের খেলা শুরু করেছিল তারা। শেষ চারটি উইকেট একাই তুলে নেন অস্ট্রেলিয়ার পেস তারকা জশ হ্যাজলউড, যিনি পুরো ইনিংসে একাই ৬টি উইকেট লাভ করেছিলেন।