আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে টানা চারদিনজুড়ে অবিস্মরণীয় এক পারফরম্যান্সের প্রদর্শন ঘটিয়ে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। বিশ্ব ক্রিকেটের টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে থাকা শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতেই এমন একপেশে দাপট দেখিয়ে পরাজিত করা যে কোনো ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের জন্যই স্বপ্নের মতো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই অধরা স্বপ্নকেই ডারউইনের সবুজ মাঠে বাস্তবে রূপ দিল বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের নয় নম্বর দল বাংলাদেশ।
দীর্ঘ ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন ও কেয়ার্নস সফরে গিয়ে সফরকারী বাংলাদেশ দলকে চরম অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। দুই দশকেরও বেশি দীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পর এটি ছিল অজিদের দেশে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সফর। টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে, এই কঠিন কন্ডিশনে বাংলাদেশ কিছুটা প্রতিরোধ বা লড়াই গড়ে তুলতে পারলেই যেন সমর্থকদের প্রাথমিক প্রত্যাশা পূরণ হতো। কিন্তু গত ১৩ আগস্ট ম্যাচের প্রথম দিনেই বাংলাদেশি পেসাররা যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং অর্ডারের ওপর বোলিং তোপ চালালেন, তাতেই মূলত এক অবিশ্বাস্য ও অবিস্মরণীয় বিজয়ের মজবুত ভিত তৈরি হয়ে যায়।
ম্যাচের প্রথম ইনিংসে টানা দুই সেশনেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশি বোলারদের একচ্ছত্র দাপট অব্যাহত থাকে। যার ফলে মাত্র ১৯৮ রানের মধ্যেই প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের অলআউট করার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বের সেরা ও বিধ্বংসী অজি বোলিং লাইনআপের সামনে হয়তো বাংলাদেশি ব্যাটাররাও একইভাবে ভেঙে পড়বেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ব্যাটিংয়েও সমপরিমাণ দাপট দেখায় বাংলাদেশ। তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম এক ঐতিহাসিক ও নান্দনিক সেঞ্চুরি উপহার দেন। পাশাপাশি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজের দায়িত্বশীল জোড়া হাফ সেঞ্চুরির ওপর ভর করে বড় সংগ্রহের শক্ত ভিত গড়ে তোলে সফরকারীরা।
এই তিন শীর্ষ ব্যাটারের অনবদ্য ব্যাটিং এবং টেল এন্ডারদের সময়োপযোগী উল্লেখযোগ্য অবদানে প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের এক বিশাল ও রেকর্ডসংখ্যক লিড অর্জন করে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে এর আগে প্রথম ইনিংসে এত বড় লিড নেওয়ার কোনো রেকর্ড ছিল না লাল-সবুজের দলের।
বিশাল রানের চাপ মাথায় নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটে নামেন অজি ব্যাটাররা। সেখানেও শুরুতেই গতি তারকা হাসান মাহমুদের জোড়া আঘাত স্বাগতিকদের কোণঠাসা করে ফেলে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে প্রথম ইনিংসে অভিজ্ঞ স্টিভ স্মিথ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে তরুণ অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন যা একটু প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ডারউইনের প্রতিকূল উইকেটে দেশের মাটিতে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে সামান্য লিড এনে দেন গ্রিন। তবে শেষ পর্যন্ত বল হাতে অফস্পিন জাদু দেখান মেহেদী হাসান মিরাজ। তাঁর ঘূর্ণি তোপে স্বাগতিকদের লিড বেশি দূর বাড়তে পারেনি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে তারা অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় একেবারেই নাগালের মধ্যে, মাত্র ৫৭ রান।
চতুর্থ ইনিংসে অতি সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিম শূন্য রানে আউট হলেও, দলকে কোনো চাপে পড়তে দেননি সাদমান ইসলাম ও অভিজ্ঞ মুমিনুল হক। তারা দুজন ধীরস্থির ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে বাকি জয়সূচক রান তুলে নেন এবং জয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। সিরিজ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট করে দেওয়ার স্মৃতি অস্ট্রেলিয়ার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে বিন্দুমাত্র কাজে আসল না। মাত্র ৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য অনায়াসে পার করে অজিদের মাটিতে ইতিহাস রচনা করল বাংলাদেশ।