অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণয়ন করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিল করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা বাতিলের মাধ্যমে সরকার প্রকারান্তরে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা বাতিলের মধ্য দিয়ে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এর ফলে ওষুধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে সরকার ওষুধ সিন্ডিকেটের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। দেশে প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদিত হলেও সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নির্ধারণ এবং সেসব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ফুয়াদ বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের পরিপত্রে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন করে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭টি থেকে বাড়িয়ে ২৯৭টিতে উন্নীত করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার গত ৩ আগস্ট ওই নীতিমালা দুটি বাতিল করে পুরোনো কাঠামোয় ফিরে গেছে।
এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জনস্বার্থে নেওয়া একটি নীতিমালা বাতিলের মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির পথ তৈরি করেছে। এটি জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে সরকারের ঘোষিত সংস্কার ও অঙ্গীকারের সঙ্গেও সিদ্ধান্তটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, জনগণের পকেট কাটার এই নীতি বাতিল করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নীতি পুনর্বহাল করতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের দাম রাখার জন্য কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশের ওষুধবাজারে ভারতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, ওষুধশিল্পের মালিক এবং চিকিৎসকদের সমন্বিতভাবে জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ না নিয়ে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়েছে।
দেশের বাজারে একই জেনেরিকের বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের নাম ও দামের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ। তিনি বলেন, দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে বিপুলসংখ্যক ওষুধ বাজারজাত করা হচ্ছে। একই জেনেরিকের ওষুধ একাধিক ব্র্যান্ড নামে বিক্রি হওয়ায় রোগী ও সাধারণ ভোক্তারা একদিকে যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, একই জেনেরিকের ওষুধকে ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করার প্রবণতা কমাতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রভাবিত করার জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে উপহার ও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির পক্ষ থেকে ওষুধনীতি নিয়ে সাত দফা দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাতিল করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ পুনর্বহাল করা। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া একই জেনেরিকের ওষুধের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ব্র্যান্ড বৈচিত্র্য ও মূল্যবৈষম্য কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো যাতে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করতে উপহার বা অনৈতিক প্রণোদনা দিতে না পারে, সে জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানায় দলটি।
সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সহজলভ্য করার দাবি জানানো হয়েছে। দেশীয় ওষুধশিল্পের সক্ষমতা এবং নতুন ওষুধ উদ্ভাবন সম্পর্কে জনগণকে তথ্য দিতে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রচারের সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বিদেশি বাজারের প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় দেশীয় ওষুধশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের দাবিও তুলে ধরা হয়। এবি পার্টির মতে, দেশের ওষুধশিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও ওষুধের সহজলভ্যতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার উপকরণ, কেবল ব্যবসার পণ্য নয়। তাই ওষুধনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে রোগী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে ওষুধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ওষুধশিল্পের মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যবসার স্বার্থ অবশ্যই থাকবে, তবে তার আগে মানুষের জীবন ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগণের বিপরীতে ওষুধশিল্পের মালিকপক্ষকে দাঁড় করানো উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ছাত্রপক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহসহ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।