ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬,  ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তিন মাসেও সংস্কার হয়নি ভাঙা কালভার্ট: দুর্ভোগে পথচারীরা নেপালে নিহত বেড়ে ৩৫৯, নিখোঁজ প্রায় এক হাজার নেপালে তৈরি হয়েছে আরেক মৃত্যুফাঁদ, সতর্ক করল চীন ৮ হাজার মুসলমান হত্যার নেতৃত্ব দেওয়া ‘বসনিয়ার কসাই’ রাটকো ম্লাদিচের মৃত্যু জুলাই সনদ নিয়ে আপত্তি, সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট গত বছরের তুলনায় কমেছে খুন, ধর্ষণ ও মব সহিংসতা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করা হয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে ৬৪ জেলার দায়িত্ব পেলেন ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিঠি পৌঁছে দিলেন হুমায়ুন কবির প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

নেপালে বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭০


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৩:৪২ পিএম

হিমালয় কন্যা নেপালে আচমকা নেমে আসা প্রকৃতির এক তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ভয়াবহ তুষারধস, পর্বতমালা থেকে নেমে আসা কাদা ধস ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে বেড়ে ২৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার সকালে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ করেই ঘটা এই তুষারধস ও আকস্মিক বন্যা পুরো অঞ্চলকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। নিমেষের মধ্যেই বদলে গেছে বিশাল এলাকার দৃশ্যপট, ভেঙে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা এবং পুরো অঞ্চলে তৈরি হয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক আপডেটে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, বুধবারের এই ভয়াবহ বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭০টি সংগৃহীত মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের তীব্রতা ও বিস্তৃতি দেখে গভীর আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, বিপুল পরিমাণ কাদা, বিশালাকার পাথর এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠামোর নিচে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন। নেপাল পুলিশ ও সেখানে উদ্ধারকাজে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্যানুযায়ী, দুর্যোগের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন মানুষ সম্পূর্ণ নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় নিখোঁজ অধিবাসীদের পাশাপাশি এই বিশাল তালিকার একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যটক ও পাহাড় ভ্রমণরত বিদেশি নাগরিকরা।


প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজ থাকা এই দেড় হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ৮০০ জনই বিদেশি নাগরিক। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ ও প্লাবিত এলাকার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পুরো ও চূড়ান্ত চিত্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রচণ্ড দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার শত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়েই যাচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলো। উল্লেখ্য যে, গত বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভয়াবহ এই তুষারধস ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। মুহুর্তের মধ্যে এই পাহাড়ি ঢল বিশাল ত্বরান্বিত গতিতে নিচের দিকে নেমে এসে আশপাশের বিস্তৃত লোকালয়, পথঘাট ও পর্যটন এলাকাগুলোকে সম্পূর্ণ প্লাবিত ও তছনছ করে দেয়।


আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই ভয়াবহ দুর্যোগের ফলে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ নিখোঁজদের তালিকায় বিভিন্ন দেশের বহু নাগরিক রয়েছেন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে জানান, নিখোঁজ থাকা দেড় হাজার মানুষের মধ্যে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। প্রতিবেশী এই দেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিক নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিয়ে উভয় দেশের সরকারের মধ্যে প্রতিনিয়ত নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।


অন্যদিকে, নেপালে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর প্রায় ১০০ জন চীনা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক বিবৃতিতে বলেন, চীন সরকার নেপাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সেই সঙ্গে নিখোঁজদের দ্রুত অনুসন্ধান ও যৌথ উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। লিন জিয়ান আরও জোর দিয়ে বলেন, নেপালের বর্তমান চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশটির প্রয়োজন অনুযায়ী চীন সব ধরনের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত রয়েছে।


এর পাশাপাশি, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ঘটা পৃথক এক ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনায় প্রায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের এই নির্দিষ্ট এলাকায় নিখোঁজ হওয়া মানুষদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে। তবে চীন ও নেপাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিখোঁজের এই পৃথক সংখ্যাগুলোর মধ্যে একই ব্যক্তির হিসাব পুনরায় যুক্ত হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া বা স্পষ্ট জানা যায়নি।


বর্তমানে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর তলিয়ে যাওয়া দুর্গম এলাকাগুলোতে নিখোঁজদের উদ্ধারে চরম তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কাদা, বিশাল পাথরখণ্ড এবং ভবন ও জনপদের উপড়ে আসা ধ্বংসাবশেষ স্রোতের মতো নেমে আসায় বহু বাড়িঘর নিমেষেই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বন্যার পানির তীব্র তোড়ে অসংখ্য সড়ক সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে গেছে এবং সংযোগকারী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেতু নদী ও খালের পানিতে ভেসে গেছে। ফলে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার পথযোগাযোগ প্রায় পুরোটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা জীবন বাজি রেখে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।


সংকট কাটিয়ে উদ্ধার কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ। বিশাল মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি এবং পাহাড়ি পথের অবকাঠামো ভেঙে পড়ার কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন উদ্ধারকারী দলকে। নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে এখনও চরম ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার।


পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডেভিড ফিশার বলেন, নেপালের উত্তরাঞ্চলের কিছু নির্দিষ্ট দুর্গম এলাকায় যাওয়ার একমাত্র পথ সড়ক ও সেতুগুলো নদী ও ধসে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন কেবল মাত্র হেলিকপ্টারে করেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তিনি জানান, তাঁর সংস্থার প্রতিনিধি দল ও সদস্যরা স্থানীয় দূরন্ত স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করছেন এবং দুর্গত অসহায় মানুষদের কাছে জরুরি খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


তিনি আরও আকুল কণ্ঠে বলেন, দুর্গত এলাকাগুলোতে বর্তমান অবস্থায় জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বহু অসহায় মানুষকে গত বুধবারের পুরো রাত খোলা আকাশের নিচে চরম দুশ্চিন্তা ও কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। ডেভিড ফিশার দুঃখজনক এই চিত্র তুলে ধরে আরও জানান, বহু সুন্দর গ্রাম এবং স্থানীয় জনবহুল বাজার এলাকা এক রাতেই বন্যার পানির প্রবল স্রোতে সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। উদ্ধার অভিযান যত সামনের দিকে এগোবে এবং কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অনুসন্ধান চালানো হবে, নিহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে অত্যন্ত মারাত্মক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।


প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে পর্যটকদের ভিড় সবসময়ই থাকে, কিন্তু হঠাৎ নেমে আসা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমগ্র অঞ্চলটিকে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। পাহাড়ি পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ফলে আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার ভয় তৈরি হয়েছে, যার ফলে স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে উদ্ধার অভিযান আরও জোরালো হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর