ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬,  ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তিন মাসেও সংস্কার হয়নি ভাঙা কালভার্ট: দুর্ভোগে পথচারীরা নেপালে নিহত বেড়ে ৩৫৯, নিখোঁজ প্রায় এক হাজার নেপালে তৈরি হয়েছে আরেক মৃত্যুফাঁদ, সতর্ক করল চীন ৮ হাজার মুসলমান হত্যার নেতৃত্ব দেওয়া ‘বসনিয়ার কসাই’ রাটকো ম্লাদিচের মৃত্যু জুলাই সনদ নিয়ে আপত্তি, সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট গত বছরের তুলনায় কমেছে খুন, ধর্ষণ ও মব সহিংসতা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করা হয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে ৬৪ জেলার দায়িত্ব পেলেন ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিঠি পৌঁছে দিলেন হুমায়ুন কবির প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

সংসদীয় রীতি না মানলে সংসদ সচল রাখা কঠিন: স্পিকার


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৬:১৮ পিএম

জাতীয় সংসদে হট্টগোল, অসৌজন্যমূলক আচরণ, কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংসদ সদস্যদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকলে এবং স্পিকারের নির্দেশনা অমান্য করে একে অপরকে কথা বলতে না দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন সময়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্যদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং হট্টগোল শুরু হয়। এতে অধিবেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বক্তব্য দেওয়ার সময় শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরু থেকেই বিরোধীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় মনোভাব প্রদর্শন করে আসছেন। তার অভিযোগ, সংসদকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের শ্রেণিকক্ষ মনে করছেন এবং নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় বসিয়ে অন্যদের ছাত্রের মতো শাসন করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।

শফিকুর রহমান বলেন, শিক্ষকতা করতে হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা উচিত, যেখানে তার পছন্দসই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে। সরকারের এমন আচরণকে তিনি সংসদীয় ফ্যাসিবাদ হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে সংসদের সৌন্দর্য ও মর্যাদা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবিলম্বে তার অসংসদীয় মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং কার্যপ্রণালী থেকে ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বিরোধী দলের সদস্যরা অপমান সহ্য করে সংসদে অবস্থান করবেন না। তার বক্তব্যের পর অধিবেশনে উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও হট্টগোল দেখা দেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে জাতীয় সংসদের নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং কার্যপ্রণালী বিধি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন স্পিকার। তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে সচল রাখতে এবং জনগণের এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে হলে রুলস অব প্রসিডিউর কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাকবিতণ্ডা এবং বিরোধী দলের সদস্যদের হট্টগোলের সমালোচনা করে স্পিকার বলেন, সরকারি দলের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা বিরোধী দলের রয়েছে। তবে কোনো মন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে সমস্বরে চেঁচামেচি করে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া সুস্থ সংসদীয় রীতি হতে পারে না।

নিজের ৪০ বছরের দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন স্পিকার। তিনি সংসদীয় রাজনীতির অতীতের বিভিন্ন তিক্ত ইতিহাসের পাশাপাশি অতীতে স্পিকারকে হত্যার মতো নির্মম ঘটনার কথাও তুলে ধরেন। এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের জন্য একটি কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ সংসদ উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো অসংসদীয় শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য কার্যপ্রণালী থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে চাপ দেওয়া তার উদ্দেশ্য নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

স্পিকার আরও সতর্ক করে বলেন, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি অন্যের বক্তব্য শোনার ক্ষেত্রেও পরমতসহিষ্ণুতা থাকতে হবে। সংসদ সদস্যরা যদি একে অপরের বক্তব্য শুনতে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করতে না পারেন, তাহলে দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে।

এরপর আবারও আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি কার্যপ্রণালী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়া বা পরীক্ষা করে দেখার অতীতের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসংসদীয় বক্তব্য স্পষ্ট এবং এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।

স্পিকার সংসদ সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করলেও ট্রেজারি বেঞ্চে সদস্য বেশি থাকা নিয়ে স্পিকারের মন্তব্যেরও কড়া প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সংসদকে সংখ্যা বা গুণের ভিত্তিতে বিভক্ত করার পক্ষপাতী নন তিনি। ভালো কাজে বিরোধী দল সবসময় সরকারের সঙ্গে একাত্ম থাকবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবে।

বিরোধীদলীয় নেতা আশা প্রকাশ করেন, স্পিকার সংসদ সদস্যদের কোনো ধারায় বিভক্ত না করে সবার সমান মর্যাদা নিশ্চিত করে সংসদ পরিচালনা করবেন। একই সঙ্গে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এদিকে অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিয়ে নিজের ক্ষোভের কথা জানান প্রবীণ সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় একটি রূপক গল্প বলার কারণে তার বক্তব্যের কিছু অংশ এক্সপাঞ্জ করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি স্পিকারের কাছে জানতে চান, তার বক্তব্যের কোন শব্দটি অসংসদীয় ছিল।

মনিরুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, তার দাড়ি ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করে তার ব্যক্তিগত ইজ্জত এবং সংসদের মর্যাদায় আঘাত হানা হয়েছে। প্রবীণ সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের সম্মান রক্ষার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টির সুরাহা ও বিচার চেয়ে স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিশের জবাব দাবি করেন।

সবশেষে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সমাপনী বক্তব্য দেন স্পিকার। মনিরুল হক চৌধুরীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাই বিষয়টি কার্যপ্রণালী দেখে পরীক্ষা করা হবে। বক্তব্যে অসংসদীয় কিছু পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সব সংসদ সদস্যের উদ্দেশে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে স্পিকার বলেন, যেভাবে একে অপরের বক্তব্যে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্পিকার কোনো সদস্যকে বসতে বলার পরও যদি সেই নির্দেশনা বা সংসদীয় রীতি মানা না হয়, তাহলে সংসদ বেশিদিন সচল রাখা সম্ভব নয়।

সংসদ পরিচালনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণ, পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখা এবং সংসদীয় রীতিনীতি অনুসরণের আহ্বান জানান। পরে আসরের নামাজের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন তিনি।


এ সম্পর্কিত আরো খবর