রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক পরিচালনা ও আর্থিক লেনদেনে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত বা এফডিআর রাখা, কয়েক ডজন শিক্ষকের গণবদলি, অ্যাডহক কমিটির বিতর্কিত প্রশাসনিক ভূমিকা, স্বার্থের সংঘাত এবং তড়িঘড়ি করে কর্মচারী নিয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের ৪৪ কোটি টাকা এফডিআর করার সিদ্ধান্ত। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে গভীর রাজনৈতিক বিবেচনা ও একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানে সরকারি তফসিলি ব্যাংক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব শাখা থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অতীতে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রেখে চরম অর্থ উত্তোলনের জটিলতায় পড়তে হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে। সেই অভিজ্ঞতার পর সরকারি ব্যাংকে টাকা রাখার সিদ্ধান্ত হলেও নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের পর আবারো বেসরকারি ব্যাংকে বিপুল অর্থ গচ্ছিত রাখার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
যদিও প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সঞ্চয়ী হিসাবের তুলনায় উচ্চ সুদের হার পাওয়ার লক্ষ্যেই এই অর্থ ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে ভাগ করে এফডিআর করা হচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংকেও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা রাখা আছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে গভর্নিং বডির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান হিরু জানান, সব অর্থ একটি ব্যাংকে স্থানান্তর করা হচ্ছে না; প্রতিষ্ঠানের সার্বিক নিরাপত্তা ও বিধি মেনেই অর্থ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে এই অর্থ লেনদেনের মাঝে স্বার্থের সংঘাতের মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা ব্যাংকের শাহজাহানপুর শাখার এক উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপক। একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা গভর্নিং বডিতে থাকা অবস্থায় ঢাকা ব্যাংকে বড় অঙ্কের এফডিআর করার ক্ষেত্রে তার প্রভাব ছিল কিনা, তা নিয়ে চরম প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
এর বাইরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। প্রায় ৪৩ থেকে ৪৪ জন শিক্ষকের শিফট পরিবর্তন ও দূরবর্তী শাখায় বদলি করার ঘটনায় শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর শিক্ষকদের ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্তা করতেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ এবং গভর্নিং বডির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান হিরু উভয়ই দাবি করেছেন যে, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শাখাগুলোর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই এই দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
অ্যাডহক কমিটির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান হিরুর জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪ লাখ টাকা খরচ করে বিলাসবহুল আলাদা অফিস তৈরি ও ব্যক্তিগত সহকারী রাখার বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য তিনি এটিকে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কক্ষ না বলে গভর্নিং বডির পুরোনো সভাকক্ষ হিসেবে দাবি করেছেন।
এদিকে প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে থেকে কাজী তৌহিদুর রহমান নামের এক বহিরাগত ঠিকাদারের বদলি ও অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে নিয়মিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলেও তিনি ও চেয়ারম্যান উভয়ই এ তথ্য অস্বীকার করেছেন। এছাড়া নতুন অ্যাডহক কমিটির কোনো ধরনের নিয়োগ দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও মাত্র সাত দিনের সংক্ষিপ্ত নোটিশে তড়িঘড়ি করে কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত সাবেক অভিভাবক সদস্য মো. শাহাদাৎ ঢালী।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং আর্থিক transparency বা স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সকল সভার রেজুলেশন, ব্যাংকিং নথি ও নিয়োগের কাগজপত্র প্রকাশ্যে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবক মহল।