কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কাজী নজরুল ইসলাম হলের ৪০৭ নম্বর কক্ষের বাইরের দেওয়াল এলাকায় ‘JCD’ সংক্ষেপণ লেখাকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা ও পরবর্তীকালে রক্তক্ষয়ী মারামারির ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে দুই শিক্ষার্থীকে হল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে হল প্রশাসন। এর পাশাপাশি পুরো অপ্রীতিকর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, হলের ৪০৭ নম্বর কক্ষের বাইরে দেওয়ালে ‘JCD’, ‘407’, ‘কি? খাবি? খুব আতাও’সহ নানা ধরনের রাজনৈতিক ও আপত্তিকর বার্তা লেখেন কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী। এসব রাজনৈতিক ও উস্কানিমূলক লেখার তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানান ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী মামুনুর রশীদ। এই নিয়ে হলের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে তাঁর সাথে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের আকাশ রাজবংশী এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সোহাগ চৌধুরীর চরম কথা কাটাকাটি হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মামুন তাদের ‘ছাত্রলীগ’ এবং প্রতিপক্ষের শিক্ষার্থীরা পাল্টা মামুনকে ‘গুপ্ত’ বলে আখ্যা দেন।
উক্ত তর্কবিতণ্ডার জের ধরে পরবর্তীতে ৫০৮ নম্বর কক্ষে সরাসরি গিয়ে মামুনুর রশীদকে শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের গুরুতর অভিযোগ ওঠে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সোহাগ চৌধুরী, আইন বিভাগের ফয়সাল এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের আকাশ রাজবংশীর বিরুদ্ধে। মারধরের এই ঘটনার সময় ইংরেজি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শনব দেবনাথ এবং মারুফ আহমেদ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী মামুনুর রশীদ।
তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে শারীরিক নির্যাতনের সকল অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, মামুনুর রশীদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁরা তাঁর কক্ষে গিয়েছিলেন। কথা বলার একপর্যায়ে মামুন হঠাৎ তাঁদের ধাক্কা দেন এবং পরবর্তীতে ফুলের টব ও ধারালো দা নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা চালালে আত্মরক্ষার্থে সামান্য হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে হল প্রভোস্টের সরাসরি উপস্থিতিতে অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলে ধারালো দা নিয়ে হামলার পাল্লা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অপরদিকে শনব দেবনাথ ও মারুফ আহমেদ দাবি করেন, তারা মারামারির ঘটনা চলাকালে সেখানে একেবারেই উপস্থিত ছিলেন না।
পরবর্তীতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে হল প্রভোস্টের রুমে উভয় পক্ষকে নিয়ে তাৎক্ষণিক মিমাংসা ও আলোচনার বৈঠক বসে। তবে সেই আলোচনার সময় প্রভোস্ট কক্ষের বাইরে হঠাৎ করেই ইংরেজি বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শনব দেবনাথ ও মারুফ আহমেদের সঙ্গে অর্থনীতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেন শুভ ও হুমায়ুন রশিদের নতুন করে মারামারি বেঁধে যায়। এই সংঘাত চলাকালে মারুফ আহমেদের মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে এবং তাঁর মাথা ফেটে রক্তাক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেন শুভ ও হুমায়ুন রশিদকে হল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়। তাঁদের বহিষ্কারের পরই হল থেকে তাঁদের ব্যবহৃত আসবাব ও বিছানাপত্র বাইরে ফেলে দেন ইংরেজি বিভাগের শনব দেবনাথ, ব্যবস্থাপনা বিভাগের রাফসান সামি এবং মার্কেটিং বিভাগের সাদেক সাকের।
সমগ্র ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে হল প্রশাসন। কমিটিতে কাজী নজরুল ইসলাম হলের হাউজ টিউটর মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ময়নাল হোসেনকে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন হাউজ টিউটর খন্দকার ওয়ালীউল্লাহ ও জহিরুল ইসলাম বাবর। এই তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিশদ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রভোস্ট জানান, হলের দেয়ালে সংক্ষেপণ লেখা ও মন্তব্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল ঝামেলার সৃষ্টি হয়েছিল। সমাধানের জন্য তাদের নিয়ে বৈঠকে বসা হলেও উভয় পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে তখন বিষয়টি সমাধান করা যায়নি। বর্তমানে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দুজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই বিশ্ববিদ্যালয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।