ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬,  ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ইরানের হুঁশিয়ারি, এক ফোঁটা তেলও নয় মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল পিতৃত্বের প্রমাণ, ফেঁসে গেলেন মাদরাসা শিক্ষক সাগর ছয় মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক: সিপিডি রাজধানীতে ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ . ৯ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আভাস হাইতিতে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডব: নিহত অন্তত ৪৭ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কড়াকড়ি: ৪৫ জাহাজের পণ্য জব্দের হুঁশিয়ারি ইরানকে একঘরে করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র

দন্তহীন অবস্থা থেকে কার্যকর দুদক: প্রশাসনিক ও বিচারিক দুর্নীতি রুখতে দরকার আমূল পরিবর্তন


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৯ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১২:৩৬ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি,আব্দুল কাইয়ুম খান

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক একজন মাননীয় বিচারপতিকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একজন প্রবীণ সাবেক বিচারপতিকে দুদকের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় বিভিন্ন সচেতন মহল থেকে সরকারকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে। একই সাথে কমিশনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দও যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। দেশজুড়ে বিস্তৃত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে নতুন এই কমিশন সুনির্দিষ্ট নীতি ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।


স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি এদেশের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের প্রধানতম প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দেরিতে হলেও সরকার ও নীতি-নির্ধারকেরা বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার ও অনিয়ম সংঘটিত হয়, আর্থিক মূল্যে তার পরিমাণ দেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে মজবুত করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে কমিশনকে এখন অত্যন্ত শক্তিশালী ও আপসহীন ভূমিকা পালন করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আক্ষরিক অর্থেই একটি দন্তহীন ও নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে রাখা হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এখনই উপযুক্ত সময় একে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর, সচল ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ারে রূপান্তর করার।


পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের মূল দুর্নীতিগুলো সংঘটিত হয় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগসাজশে। তাই সরকারি খাতগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে পুরো ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। পদ্ধতিগত পরিবর্তন ও ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করতে পারলে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট সুযোগগুলো অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।


জাতীয় পর্যবেক্ষণ ও জনপরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), দেশের বিচার ব্যবস্থা, বাংলাদেশ ভূমি অফিস এবং সব সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্টার কার্যালয়। বিচার বিভাগে বিচারিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের একাংশে কিছু অসাধু কর্মকর্তা, বিচারক, পেশকার ও আইনজীবীদের যোগসাজশে যে ঘুষ-দুর্নীতির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তাতে ন্যায়বিচারপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।


এ ছাড়াও বাংলাদেশ পুলিশের সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), শিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ সচিবালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে অনিয়মের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।


বাস্তবতা হলো, দেশের ছোট-বড় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই কোনো না কোনোভাবে অনিয়ম বাসা বেঁধেছে। যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছে, আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে। জনমনে ধারণা জন্মেছে যে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আনুমানিক ৮৫ শতাংশ মানুষ নানাভাবে দুর্নীতির সাথে যুক্ত। আর যে ১৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী সততা বজায় রেখে চলছেন, তাদেরকে কোনো দপ্তরে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে দেওয়া হয় না। সততার কারণে পুরস্কৃত করার বদলে তাদেরকে দ্রুত বদলি করে দেওয়ার যে অন্যায় প্রথা চালু রয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।


দুর্নীতির এই ভয়াল থাবার সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা ব্যক্তিদের কোনো সরকারি দপ্তরে গেলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবিকৃত ঘুষ না দিলে সাধারণ মানুষের বৈধ ও ন্যায্য কাজগুলোও অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হয়। দুর্নীতির সাথে আপস না করলে সঠিক সেবা না পাওয়ার এই সংস্কৃতিই বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ।


এই পরিস্থিতি নিরসনে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সামনে এসেছে। প্রথমত, কমিশনকে সব ধরনের সরকারি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। বর্তমানে কমিশনের মাত্র ২,১৪৬ জন জনবল রয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে এটি ২০ হাজারে উন্নীত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা এবং তদন্ত চলাকালে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাচার হওয়া আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।


বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রতি জেলায় দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে প্রতিটি উপজেলায় দুদকের শাখা কার্যালয় চালু করা আবশ্যক। একই সাথে কমিশনের ভেতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। সব সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব কম্পিউটারের ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা জরুরি। এ ছাড়া দুদকের নিজস্ব আধুনিক যানবাহন ও একটি বিশেষায়িত সুসজ্জিত ফোর্স গঠন করতে হবে, যাতে যেকোনো মুহূর্তে দুর্নীতিবাজদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের সোপর্দ করা সম্ভব হয়।


প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। সরকারি সিম কার্ড কেবল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফোন ধরার জন্য নয়, সাধারণ মানুষের সেবায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের সঠিক তথ্য পেতে সহযোগিতা করা দরকার। সম্প্রতি চরের অবৈধ বালি উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন তোলায় একজন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন সাংবাদিককে উল্টো চাঁদাবাজ আখ্যা দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া ভূমি অফিসগুলোতে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের জরিমানার সমুদয় অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে কিনা, তা অডিটের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার; যেমনটি কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সারোয়ারের আমলের রাজস্ব আদায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতির অন্যতম উদাহরণ দেখা যায় গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (পিটিশন মামলা নং ৫৮৪/২০২২)। সেখানে বিবাদী সাবেক জেলা ছাত্রলীগ নেতা ৫ই আগস্টের পর থেকে একাধিক মামলায় পলাতক ও কারাগারে আটক থাকা সত্ত্বেও পেশকার ও আইনজীবীর যোগসাজশে তার ভুয়া হাজিরা বহাল রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাদী পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ নথি ফাইলের নিচে চেপে রাখা হচ্ছে। বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই ধস রোধে নতুন কমিশনের সাহসী ও কঠোর পদক্ষেপই এখন দেশের একমাত্র প্রত্যাশা।



এ সম্পর্কিত আরো খবর