শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) বেলা পৌনে দুইটার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন এবং মূল ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।
ফেসবুক পোস্টে এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন, ‘সংসদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায়ভার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই আমি বক্তব্য দিয়েছিলাম। তবে সেই বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্মানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
মূল ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা কিংবা সিনেমা প্রদর্শনী অনেকটা নিষিদ্ধের মতো হয়ে গেছে। এই ধরনের বক্তব্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত নিজের মন্ত্রণালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় আলেম–ওলামাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন। এর মাধ্যমে বিশ্বদরবারে সেখানকার আলেম-ওলামা ও সাধারণ অধিবাসীদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেন।
পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমের খবরের সমালোচনা করে এনসিপি নেতা জানান, সে সময়ের বাস্তব চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। মূলত গভীর রাতে বিকট শব্দে গান-বাজনা চলায় স্থানীয় মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় চরম ব্যাঘাত ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা কেবল শব্দের মাত্রা কমানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যম ঘটনাটিকে অন্যভাবে চিত্রায়িত করলেও স্পষ্ট যে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট পুরোপুরি বন্ধ করতে চাননি, তারা শুধু শব্দের তীব্রতা কমানোর দাবি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার পরিবেশ ছিল না, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করেছেন।
একই সঙ্গে বক্তব্য প্রদানের সময় একটি তথ্যগত ভুলের কথা স্বীকার করে হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, নৌকাবাইচ বন্ধ হওয়ার বিষয়টি মূলত সিলেটে ঘটেছিল, যা তিনি ভুলবশত ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলেছিলেন। এই অনিচ্ছাকৃত তথ্যগত ত্রুটির কারণে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি নিজে অত্যন্ত বিব্রত এবং এর জন্যও গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংসদের ভেতরে বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে না পারার কারণ দর্শিয়ে এনসিপির এই সংসদ সদস্য জানান, সম্পূরক প্রশ্ন করার জন্য বরাদ্দকৃত সময় অত্যন্ত সীমিত থাকায় মূল ঘটনাপ্রবাহ এবং মিডিয়ার ফ্রেমিং নিয়ে বিশদ কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লেখেন, ‘জুলাই এক সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কেউ কারও ব্যক্তিগত মত বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অপরের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেবে না। সামাজিকভাবে মতপার্থক্য কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে, তবে নিজের মতামতকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করে কাউকে তা মানতে বাধ্য করা যাবে না। জুলাই হচ্ছে এই নূন্যতম ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। এই মহান আদর্শের প্রতি আমি অতীতে কমিটেড ছিলাম, এখনও আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।’
সরকারের দায়িত্ব ও সুরক্ষার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো সেটাকে শক্ত হাতে প্রতিহত করা এবং সব নাগরিকের সম-অধিকার নিশ্চিত করা। সরকার যখন এই প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে দ্বিধাগ্রস্ত হয় বা ব্যর্থ হয়, তখনই দেশে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অবনতি ঘটে এবং জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকিতে পড়ে। সংসদে তিনি মূলত সরকারের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিষয়টির প্রতিই আলোকপাত করতে চেয়েছিলেন।
নিজের স্বপ্নের বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, এই স্বাধীন বাংলাদেশে সবার সমান অধিকার ও সহাবস্থান থাকবে। এখানে একই সঙ্গে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, মারফতি সংগীত থাকবে, ওয়াজ মাহফিল থাকবে, রথযাত্রা হবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, আবার সিনেমা উৎসবের পাশাপাশি বিজ্ঞ আলেমদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও অনুষ্ঠিত হবে। এটি হবে সকল ধর্মের ও সকল মতের একটি সুন্দর মিলনস্থল। যার যেটা পছন্দ, সে স্বাধীনভাবে সেটাতেই অংশ নেবে। আর সরকারের একমাত্র মূল দায়িত্ব হবে এটি নিশ্চিত করা যেন কেউ কারও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে। সরকার সেই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই আজ সমতার বাংলাদেশ গঠনের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করার সময় হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেছিলেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। তারা হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিয়ে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায় এবং ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত জেলাটিতে এনসিপির সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। এছাড়া সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমেও বক্তব্যটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ট্রল তৈরি হয়। এসব সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই শনিবার নিজ অবস্থান পরিষ্কার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।