মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় অপরাধীদের বেপরোয়া তাণ্ডবে থামছেই না নারী ও শিশু নির্যাতনের জঘন্য ঘটনা। সম্প্রতি উপজেলার পৃথক দুটি স্থানে দুই ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের চরম আর্থিক অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধ সালিশের মাধ্যমে বিষয়টিকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। অপরদিকে, অন্য ঘটনাটিতে ধর্ষককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় সচেতন জনতা।
প্রথম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে মাধবপুর উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের অন্তর্গত গোয়ালনগর গ্রামে। গত ২০ আগস্ট দুপুরে নিজ বসতবাড়িতে একা পেয়ে এক কিশোরীকে জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে পার্শ্ববর্তী মুরাদপুর গ্রামের হানিফ মিয়া। ধর্ষণের ফলে গুরুতর অসুস্থ ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় কিশোরীকে দ্রুত উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর পরিবার যখন অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল, ঠিক তখনই স্থানীয় মাতব্বররা তাতে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জানা গেছে, গত ২৬ আগস্ট ইউপি সদস্য আবেদুর রহমান আবেদ এবং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী মাতব্বরের উপস্থিতিতে এক বেআইনি সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অপরাধী হানিফকে মাত্র ৯০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে পুরো ঘটনাটি জোরপূর্বক ‘মীমাংসা’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর অসহায় মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, "আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ, নিয়মিত মামলা চালানোর আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। ফলে বাধ্য হয়ে মেম্বারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ৯০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হলেও আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা।" আইনজীবীরা এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি চরম অ-আপসযোগ্য ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ এবং সালিশের নামে এই ধরনের গুরুতর বিচার ধামাচাপা দেওয়া সম্পূর্ণ আইনি দণ্ডনীয় অপরাধের শামিল।
অন্যদিকে, উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগান এলাকায় কারখানার এক নারী সহকর্মীকে বিবাহের ভুয়া প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে অভি সাওতাল (২৫) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। গত ২৮ আগস্ট বিকেলে ওই নারীকে চা বাগানের ২০ নম্বর সেকশনের নির্জন স্থানে ডেকে এনে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয়। এ সময় ভুক্তভোগীর আকুল চিৎকারে আশেপাশের স্থান থেকে স্থানীয় জনতা দ্রুত এগিয়ে আসে এবং অভিযুক্ত অভিকে হাতেনাতে আটক করে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টি ঘরোয়াভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও সচেতন জনতার তোপের মুখে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২৯ আগস্ট অভিযুক্তকে সরাসরি মাধবপুর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
একই উপজেলায় পরপর দুটি জঘন্য ধর্ষণের ঘটনা এবং এর একটিতে বেআইনি সালিশ বসিয়ে অপরাধীকে আড়াল করার অপচেষ্টায় পুরো এলাকায় তীব্র সামাজিক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে গোয়ালনগরের মূল ধর্ষকের পাশাপাশি এই অবৈধ সালিশের সাথে জড়িত প্রভাবশালীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান, সব অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো ছাড় না দিয়ে কঠোর ও আই নানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।