রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সাখওয়া দিঘী সংলগ্ন এলাকার বাঘমারা পদ্মবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব ও অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতির কবিমন মানুষদের কাছে এলাকাটি এখন এক নতুন ও অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে ফুটে থাকা হাজার হাজার তাজা পদ্মফুল, নির্মল ও মুক্ত বাতাস এবং চারপাশের বুকজুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিদিন বিমোহিত ও মুগ্ধ করছে আগত হাজারো উৎসুক দর্শনার্থীকে। প্রতিদিন ভোরের প্রথম স্নিগ্ধ আলো থেকে শুরু করে গোধূলির লালচে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই মনোরম প্রকৃতির অপার ও অনাবিল রূপ স্বচক্ষে কাছ থেকে উপভোগ করার তাগিদে দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসছেন অসংখ্য উৎসুক ভ্রমণপিপাসু মানুষ।
বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমের আগমন ঘটার সাথে সাথেই সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই বাঘমারা পদ্মবিলের চারপাশ যেন এক মোহনীয় ও স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে। বিলের শান্ত ও টলমলে পানির ওপর মাথা উঁচু করে ফুটে থাকা সারি সারি লাল ও গোলাপী রঙের পদ্মফুল আর তার চারপাশে থাকা জলজ প্রকৃতির সবুজের অপূর্ব সমারোহ এক অত্যন্ত অপূর্ব ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করে চলেছে। বিলে থাকা ছোট ছোট রঙিন কাঠবোঝাই নৌকায় চড়ে ভেসে বেড়ানোর পাশাপাশি নয়নাভিরাম তাজা পদ্মফুলের এই অপরূপ রূপ সরাসরি দেখার সুবাদে দর্শনার্থীদের আনন্দের মাত্রা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের স্বপরিবার, দূরীয় আত্মীয়-স্বজন ও পরম প্রিয় বন্ধুদের সাথে নিয়ে সাপ্তাহিক বিশেষ ছুটির দিনে কিংবা ব্যস্ত জীবনের কাজের ফাঁকে এখানে একটু সময় কাটাতে ও ফুরসত মেলাতে পরম আগ্রহে ছুটে আসছেন। বিলের শান্ত জলে নৌকায় বসে প্রকৃতির এই অপূর্ব ও নির্মল সৌন্দর্যকে তারা স্মৃতির ক্যানভাসে বন্দি করার পাশাপাশি নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরায় পরম সানন্দে রূপদান করছেন।
এলাকার স্থায়ী প্রবীণ অধিবাসীরা জানান, বিগত মাত্র কয়েক বছর আগেও তাড়াশের ঐতিহ্যবাহী বাঘমারা পদ্মবিলের এই অভূতপূর্ব সৌন্দর্য স্থানীয় এলাকার বাইরে এতটা ব্যাপকভাবে পরিচিত বা প্রচার লাভ করেনি। তবে সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় ও দূরদূরান্তের ঘুরতে আসা মানুষদের মুখে মুখে পদ্মফুলে ভরা এই বিলের অসীম সৌন্দর্যের কথা ধীরে ধীরে চারদিকে ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর প্রত্যক্ষ সুফল হিসেবে বর্তমানে প্রতিদিনই পদ্মবিলের চোখজুড়ানো রূপ দর্শনে আগ্রহী দর্শনার্থীদের আগমন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সৌন্দর্যপিপাসু ও ভ্রমণপ্রিয় হাজারো মানুষের কোলাহল, প্রাণবন্ত সমাগম ও উপচে পড়া ভিড় অত্যন্ত সহজেই যে কারও চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, ঐতিহ্যবাহী বাঘমারা পদ্মবিলের মনোমুগ্ধকর রূপ ও শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করার স্বার্থে এখন নিয়মিতভাবে দেশের বহু দূরদূরান্তের এলাকা থেকে অগুনতি দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন। সাধারণত একদম ভোরের মিষ্টি রোদের আলো যখন পানির ওপর ফুটে থাকা পদ্মফুলগুলোর ওপর এসে পড়ে, তখন পুরো বিলের চারপাশের দৃশ্য দেখতে সবচেয়ে চোখজুড়ানো ও মনোমুগ্ধকর লাগে। বিলে অপেক্ষারত সুসজ্জিত ও নিরাপদ নৌকায় চেপে ঘুরে ঘুরে ছোট-বড় সকল বয়সের দর্শনার্থীরাই ভীষণ উল্লাসে, সুখে ও আনন্দে সময় অতিবাহিত করছেন।
এই মনোরম বিলে ঘুরতে আসা কয়েকজন উৎফুল্ল দর্শনার্থী জানান, যান্ত্রিক শহরের একঘেয়ে, কোলাহলপূর্ণ ও ব্যস্ত জীবনধারার মানসিক ক্লান্তি কাটিয়ে উঠে একটু মানসিক প্রশান্তি, প্রফুল্লতা ও স্নিগ্ধ স্বস্তি পেতে তারা বারবার সুযোগ পেলেই এই রূপসী পদ্মবিলে ছুটে আসছেন। কাঠের তৈরি নৌকায় ভেসে জল আর পদ্মবিলের অনাবিল সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছু অমূল্য, স্মৃতিময় ও দারুণ আনন্দঘন মুহূর্ত কাটানোর এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হচ্ছে রূপময় এই স্থানে।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের ভাষ্য, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এই বাঘমারা পদ্মবিলকে যদি সরকারি বা বেসরকারি সুনির্দিষ্ট কোনো সুপরিকল্পিত টেকসই প্রকল্পের আওতায় পর্যটনবান্ধব অঞ্চল হিসেবে আধুনিকায়ন করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে এই সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত ও আগমন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে তারা বাঘমারা বিলের এই অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্মফুলগুলোকে সব ধরনের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানান।
প্রকৃতির অনন্য রূপের সাথে অগণিত ফুটন্ত পদ্মফুলের এমন অপূর্ব মেলবন্ধনে সিরাজগঞ্জের তাড়াশের ঐতিহ্যবাহী এই বাঘমারা পদ্মবিল এখন সত্যিই রূপসী বাংলারবুকে এক টুকরো স্বর্গের রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।