আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
আমতলী উপজেলার চাওড়া নদী ও এর শাখা নদীর ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঘন কচুরিপানা পরিষ্কার করার কাজে ব্যাপক নয়ছয় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঠিকাদার যেভাবে নদী থেকে কচুরিপানা কাটছেন, তাতে এটি পুরোপুরি অপসারিত হবে না; বরং উল্টো নতুন করে কচুরিপানা বংশবিস্তার করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। চরম জনদুর্ভোগ ও পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত তদন্তপূর্বক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
আমতলী উপজেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত চাওড়া বদ্ধ নদী ও শাখা নদীগুলো দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কচুরিপানায় পরিপূর্ণ হয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কচুরিপানার কারণে খালের পানি পচে গিয়ে চারদিকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পুরো এলাকার সার্বিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে এমন দুষিত ও বাস অযোগ্য পরিবেশে আমতলী উপজেলার হলদিয়া, চাওড়া, কুকুয়া, আমতলী সদর ইউনিয়ন এবং আমতলী পৌরসভার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ অত্যন্ত কষ্টের সাথে জীবনযাপন করছেন। ঐতিহ্যবাহী এই নদীর ভয়াবহ কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য বিগত এক দশক ধরে টানা আন্দোলন করে আসছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীরা।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০২৩ সালে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘সুবন্দী প্রকল্প’ নামে একটি বিশেষ উদ্যোগ ও প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত এই নদীর কচুরিপানা সম্পূর্ণ পরিষ্কার করার কাজ পায় পটুয়াখালীর বশির নামের এক ঠিকাদার। চুক্তি অনুযায়ী সম্প্রতি ঠিকাদার উক্ত নদীর কচুরিপানা উত্তোলনের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। কিন্তু কাজ শুরুর প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কচুরিপানা উত্তোলনে ব্যাপক নয়ছয় ও অনিয়ম করা হচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ তুলেছেন নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ।
প্রকল্পের সরকারি দরপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, উপযুক্ত শ্রমিক দিয়ে নদীর কচুরিপানার মূল ও গোড়াসহ সম্পূর্ণ তুলে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই আর নতুন করে কচুরিপানা বংশবিস্তার করতে না পারে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ঠিকাদার বশির উদ্দিন শ্রমিক দিয়ে শিকড় থেকে কচুরিপানা না তুলে কেবল ভাসমান মেশিন দিয়ে কচুরিপানার উপরের অংশ কেটে চলেছেন। নদীপাড়ের বাসিন্দারা এভাবে অকার্যকর পদ্ধতিতে কচুরিপানা কাটার বিষয়ে বারবার নিষেধ করলেও ঠিকাদারের লোকজন সে কথায় কোনো পাত্তা দিচ্ছেন না।
এদিকে নদীতে কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজে অনিয়ম ও দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ পেয়ে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ঠিকাদার বশির উদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। প্রদানকৃত সেই নোটিশে কঠোরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি দরপত্রের নিয়ম ও নির্দেশনা অনুসারে যদি নদীর কচুরিপানা সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা হয়, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার ও ঝুঁকি ঠিকাদারের ওপরই বর্তাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কোনো অনিয়মের দায়ভার গ্রহণ করবে না এবং কাজের বিলও কোনো অবস্থায় ছাড় দেওয়া হবে না।
সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে একটি যান্ত্রিক মেশিন বসিয়ে কচুরিপানার কেবল উপরিভাগ কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু পানির নিচে কচুরিপানার প্রধান মূল ও গোড়ার অংশ সম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। অধিকন্তু, কেটে ফেলা কচুরিপানার সেই অবশিষ্টাংশ নদীর পানির মধ্যেই ফেলে রাখা হচ্ছে। নদীর পাড়ে বসবাসকারী স্থানীয় অধিবাসী মোহাম্মদ শিবলী শরীফ ও নজরুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঠিকাদার কোনোভাবেই মেশিন দিয়ে কেটে কচুরিপানা স্থায়ীভাবে অপসারণ করছেন না, বরং এভাবে কাটার ফলে নতুন করে যেন আরও দ্রুত কচুরিপানা বংশবিস্তার করতে পারে সেই ব্যবস্থা করছেন।
তারা আরও বলেন, ঠিকাদারের নিয়োজিত লোকজন কেবল মেশিন দিয়ে পানার ওপরের অংশ ছেটে দিয়ে চলে যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। একে তো দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কচুরিপানার পচা পানিতে এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে আছে, তার ওপর যেভাবে আধাকাটা কচুরিপানা পানিতে ভাসিয়ে রাখা হচ্ছে, তাতে এগুলো আরও পচে পরিবেশ দ্বিগুণ দূষিত হয়ে উঠবে। এলাকার আরেক ভুক্তভোগী সুফিয়া বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, কচুরিপানা তোলার কাজ শুরু হতে দেখে ভেবেছিলাম আল্লাহ হয়তো আমাদের পচা পানির কষ্ট থেকে এবার রক্ষা করবেন। কিন্তু যে অদ্ভুত উপায়ে তারা কাজ করছে, তাতে রক্ষা পাওয়া তো দূরকের কথা, সামনে আমাদের আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে হবে।
উত্থাপিত অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার বশির উদ্দিনের ব্যবস্থাপক (ম্যানাজার) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন সাফাই গেয়ে বলেন, নদীর পানি প্রচণ্ড নষ্ট ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় শ্রমিকরা সরাসরি পানিতে নেমে কাজ করতে চাইছে না। সেই কারণে সাময়িকভাবে মেশিন দিয়ে ওপরের অংশ কেটে পানাগুলো নদীর কিনারে টেনে তুলে আনা হচ্ছে।
অনিয়মের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানান, দরপত্র অনুযায়ী শ্রমিক নামিয়ে নদী থেকে কচুরিপানার গোড়াসহ মাটি থেকে পুরোপুরি তুলে আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন কচুরিপানা গজাতে না পারে। অনিয়ম চোখে পড়ায় ঠিকাদারকে ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিত নিয়ম না মানলে সব আর্থিক ও আইনি দায় ঠিকাদারকেই বহন করতে হবে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হান্নান প্রধান বলেন, ঠিকাদারকে ঘন কচুরিপানা সঠিকভাবে ও স্থায়ীভাবে পরিষ্কার করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তাকে সরকারি সিডিউল ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী শতভাগ স্বচ্ছতা মেনে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে হবে, অন্যথায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।