বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর বাউফলে ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার বিএনপি নেতা ফরিদ উদ্দিন গাজীকে (৪৫) দলীয় সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির সদস্য পদসহ তাঁর সব সাংগঠনিক দায়িত্বও বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মজিবুর রহমান টোটন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে প্রাণনাশের হুমকি, বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ড সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি দলের শৃঙ্খলা, আদর্শ ও সাংগঠনিক ভাবমূর্তির পরিপন্থী হওয়ায় এবং বাউফল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা বিএনপি ফরিদ উদ্দিন গাজীকে দলের সদস্য পদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
দলীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি বিএনপির কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় সাংগঠনিক নেতৃবৃন্দের কাছেও পাঠানো হয়েছে। এর আগে বৃস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ একটি মামলায় ফরিদ গাজীকে বিলবিলাস বাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে পটুয়াখালী আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল (৫৩) গৌরাঙ্গ চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে। তাঁর বাড়ি বাউফল সদর ইউনিয়নের বিলবিলাস বাজার এলাকায়। তিনি ঢাকায় ভূমি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলের অভিযোগ, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচারণার জন্য তাঁর পোস্টার-ফেস্টুন লাগানো হয়। এ নিয়ে ফরিদ গাজী তাঁর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে মোবাইল ফোনে জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়া হয়।
কালবেলার প্রতিনিধির কাছে গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘ফরিদ গাজী আমার কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি আমাকে জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। এ ঘটনায় আমি থানায় অভিযোগ করেছি। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।’
গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলের দাবি, ফরিদ গাজীর সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড রয়েছে। ওই অডিও রেকর্ড কালবেলার প্রতিনিধির কাছেও সংরক্ষিত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে।
অডিওতে ফরিদ গাজীকে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর ব্যবসায়ী গোবিন্দ মন্ডলকে উদ্দেশ্য করে জীবিত পুড়িয়ে মারার কথা বলতে শোনা যায়। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ নোমো ( হিন্দু) মারা যাওয়ার পর পোড়ানো হয়। আর আমি একটা নোমোকে (হিন্দু) জীবিত পোড়াই মারমু...। আর সেটা হলেন আপনি। এছাড়াও অডিওরেকডিংএ ওই ব্যক্তিকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়ার কথাও শোনা যায়। তবে গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলের করা সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের উল্লেখ নেই।
১৭ সেপ্টেম্বর বাউফল থানায় করা জিডিতে নির্বাচনী পোস্টার-ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে ফোনে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। (জিডি নম্বর ১০৭৮/২০২৬ তারিখ ১৭/০৯/২৬) জিডিতে বলা হয়, পোস্টার-ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে এর দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তাবে বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ফরিদ গাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তবে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফরিদ গাজীর নাম উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির মূল তালিকায় নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাই কমান্ড উপজেলা কমিটিতে সদস্য হিসেবে কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেখানে ফরিদ গাজীর নাম আছে। বিষয়টি জেলা কমিটিকে জানানোর পর তাকে দল থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে।’
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ছুটিতে আছি। অভিযোগ পত্র পেয়েছি। ফরিদ গাজীকে অন্য একটি মালমায় গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে, ফরিদ গাজী আগে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফরিদ গাজীকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থানও স্পষ্ট হলো।