আইফোন ছিনতাইয়ের লোভেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচন করে ঘটনায় জড়িত চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে প্রধান অভিযুক্তের বসতঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাই হওয়া আইফোনটি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। পুলিশ হেফাজতে নেওয়া অভিযুক্তরা হলেন—সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ফাহাদ, কামরুল এবং সিয়াম। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই তারা সবাই নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। মূল অভিযুক্ত তুহিন কুমিল্লা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির সাবেক শিক্ষার্থী, যিনি ২০২৫ সালে পড়াশোনা থেকে ড্রপআউট হন।
হত্যাকাণ্ডের কালানুক্রম ও তদন্তের কৌশল তুলে ধরে পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার দিন অর্থাৎ গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনুমানিক দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে অভিযুক্ত তুহিন কৌশল করে কিশোর অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের ‘সানন্দা’ এলাকার গহীন ও নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে অপ্রতিমের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ তদন্ত ত্বরান্বিত করতে পার্শ্ববর্তী এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে। ফুটেজ দেখে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক সংবাদ প্রকাশের আগেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
টানা জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন পুলিশের কাছে স্বীকার করে যে, অপ্রতিমের ব্যবহৃত দামি আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে সুপরিকল্পিতভাবে তাকে পাহাড়ঘেরা নির্জন স্থানে ডেকে নিয়েছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ফাহাদ ও ফাহাদের এক বন্ধু। তুহিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী কামরুলের সন্ধান মেলে এবং তাকেও আটক করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইফোন উদ্ধারের রোমহর্ষক অভিযানের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তুহিন পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে আইফোনটি লুকিয়ে রাখার স্থান সম্পর্কে একাধিক ভুল তথ্য দেয়। তার দেওয়া ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য তিনটি স্থানে ব্যর্থ অভিযান পরিচালনার পর কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে সত্য প্রকাশ করে। পরবর্তীতে তার দেখানো তথ্যমতে নিজস্ব বাসভবনের তোশকের নিচ থেকে অক্ষত অবস্থায় নিহত অপ্রতিমের আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের হাত থেকে মোবাইলটি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ঘাতকেরা। এ সময় অপ্রতিম অসীম সাহসে বাধা দিলে তাদের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ফাহাদ ও কামরুল শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপরিউপরি আঘাত করতে থাকে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে ঘাতকেরা আইফোনটি নিয়ে চম্পট দেয়।
মামলার বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান স্পষ্ট করে জানান, বর্তমানে আটক সিয়ামের সম্পৃক্ততা গভীর গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূল অভিযুক্ত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে বিজ্ঞ আদালতে নির্ভুল পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করা হবে। রামিসা হত্যা মামলার মতো এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডেও যেন দ্রুত বিচারিক রায় আসে, সেই লক্ষ্যে আদালতের কাছে জোর আবেদন জানানো হবে।