আসন্ন
একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন পুস্তকের বাজারে ভুয়া ও নকল বইয়ের
সয়লাব তৈরি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের
(এনসিটিবি) মূল ও অনুমোদিত বই
বাজারে আসার আগেই একটি প্রতারক চক্র নিচু মানের ও ভুলে ভরা
নকল বই বিক্রি করে
শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলছে। এর ফলে একদিকে
যেমন শিক্ষার্থীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিশাল অংকের রাজস্ব।
সম্প্রতি
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে রাজধানীর
একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী শারমীন আক্তার এই প্রতারণার মুখোমুখি
হন। তিনি মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার
একটি দোকান থেকে বাংলা গদ্য, পদ্য ও সহপাঠ বই
সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে সহপাঠীদের বইয়ের সঙ্গে মিল না থাকায় নীলক্ষেতে
এসে আসল বই খুঁজতে গিয়ে
জানতে পারেন, একাদশ শ্রেণির প্রকৃত পাঠ্যবই বাজারে আসতেই বাকি রয়েছে। ছোট ছোট কিছু দোকানে যে বইগুলো বিক্রি
হচ্ছে, তার পুরোটাই প্রতারক চক্রের তৈরি নকল সংস্করণ, যেখানে সিলেবাসের মধ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে।
আগামী
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নতুন পাঠদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এনসিটিবির অনুমোদন নিয়ে এবং সরকারকে নির্দিষ্ট রয়্যালিটি পরিশোধ করে বৈধ প্রকাশনাগুলো পাঠ্যপুস্তক বাজারে ছড়ায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে আসল বই পৌঁছানোর পূর্বেই
সক্রিয় হয়ে উঠেছে নকল বইয়ের সিন্ডিকেট। বেনামি ছাপাখানার মাধ্যমে অবৈধভাবে এই বইগুলো বাজারে
সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত
১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর গুদারাঘাট সংলগ্ন 'পানির ফ্যাক্টরির গলি'র একটি নামবিহীন
ছাপাখানায় এমনই এক গোপন চক্রের
সন্ধান মিলেছে। মানিক মিয়ার মালিকানাধীন ওই প্রেসে এনসিটিবির
অনুমোদিত বিভিন্ন বই অবৈধভাবে ছাপানো
হচ্ছিল। খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফ এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সেখানে যৌথ অভিযান চালান। ঘটনাস্থলে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর 'বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি' এবং
হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো
গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের বিপুল পরিমাণ ফর্মা ও কাভার উদ্ধার
করা হয়।
তবে
অভিযানের সময় প্রেসের সাথে জড়িত ফয়সাল ও মাসুদ রানার
নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫
জনের একটি সন্ত্রাসী দল পুলিশ ও
প্রকাশকদের ওপর চড়াও হয়। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গালিগালাজ করে এবং হাসান বুক হাউজের দুই প্রতিনিধির ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের তীব্র বাধার মুখে পুলিশ বাধ্য হয়ে জব্দ তালিকা অসম্পূর্ণ রেখেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। অভিযুক্ত মাসুদ রানা দাবি করেন যে তিনি বৈধভাবেই
ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তবে ফয়সাল এ বিষয়ে কোনো
মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফ জানান, অবৈধ প্রেসে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও এনসিটিবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে
জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের
মতে, কপিরাইট আইনের বিভিন্ন দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরের সুযোগ
নিয়ে এই অপরাধ চক্রটি
বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে নিয়মিত
রাজস্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রকৃত ও বৈধ প্রকাশকরা
চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এনসিটিবি ১২ শতাংশ রয়্যালিটির
বিনিময়ে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর মাধ্যমে বই বাজারজাত করলেও,
নকল বইয়ের অবাধ বিক্রির কারণে সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব হারাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।