আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
লেখক পরিচিতি
আমি আব্দুল কাইয়ুম খান, একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। বর্তমানে আমি হার্টের ছয়টি ব্লকের ওপেন হার্ট সার্জারি এবং সি.কে.ডি (দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ)-র জটিলতা নিয়ে জীবনযাপন করছি। আমার দৈনন্দিন চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত জি.টি.এন (GTN) স্প্রে ব্যবহার করতে হয় এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য পকেটে স্প্রে ও জিহ্বার নিচে দেওয়ার ওষুধ সঙ্গে রাখতে হয়। তা সত্ত্বেও, য যতদিন বেঁচে আছি, পূর্ব বাংলার প্রকৃত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এই জনপদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখার পবিত্র দায়িত্ব পালন করে যাবো।
ব্রিটিশ আমলে বাংলার হিন্দু জমিদারদের ভূমিকা ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে নানা ঐতিহাসিক বিতর্ক ও সমালোচনার অবকাশ রয়েছে—সেটিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে একই সঙ্গে এটি একটি অনস্বীকার্য ও নির্মম সত্য যে, বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের প্রতিটি মজবুত ইট মূলত তাদেরই হাতে গাঁথা হয়েছিল। আজ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে যে গর্ব করি, তারও ৫০ থেকে ১০০ বছর আগে এই জনপদে যে কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার বাতি জ্বালিয়েছিল, তার প্রায় সিংহভাগই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিন্দু জমিদার, রাজা ও বরেণ্য শিক্ষানুরাগীদের উদার দান এবং পৃষ্ঠপোষকতায়।
তৎকালীন সময়ে মুসলিম সমাজ আর্থ-সামাজিক কারণে, শিক্ষার অভাব এবং ব্রিটিশ বিরোধিতার ফলস্বরূপ ইংরেজি শিক্ষা থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে ছিল। সেই অন্ধকার ও রূপান্তরমূলক যুগে হিন্দু জমিদাররা তাদের জমিদারির নিজস্ব আয় থেকে জমি দান করে, দীঘি ও পুকুর উৎসর্গ করে এবং भव्य ভবন নির্মাণ করে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন, তার একটি বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
১. উত্তরবঙ্গের শিক্ষা বিস্তার
রংপুর কারমাইকেল কলেজ (১৯১৬): রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের হিন্দু জমিদারগণ, বিশেষ করে তাজহাটের প্রভাবশালী জমিদাররা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি ও আর্থিক অনুদান প্রদান করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়, তবে এর মূল ভিত্তি ও ভৌগোলিক অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জমিদারদের দাক্ষিণ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
রাজশাহী কলেজ (১৮৭৩): এটি বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কলেজ। দিঘাপতিয়া রাজ পরিবারের রাজা প্রমথনাথ রায় বাহাদুর এবং পুঠিয়ার মহীয়সী রাণী হেমন্ত কুমারী দেবী এই কলেজটির প্রতিষ্ঠায় প্রভূত অর্থ ও জমি দান করেন। আজও রাজশাহী কলেজের ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ভবনটি তাদের মহান দানের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ (১৮৯৮): পাবনার বিশিষ্ট জমিদার শ্রী গোপাল চন্দ্র লাহিড়ী নিজ উদ্যোগে এবং নিজের দান করা জমিতে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা উত্তরবঙ্গের শিক্ষা বিস্তারে এক বিশাল মাইলফলক।
দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ: মহারাজা গিরিজানাথ রায় বাহাদুরের উদার আর্থিক ও ভূ-সম্পত্তি দানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে।
২. দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষা বিস্তার
বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ (১৮৮৯): প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী অশ্বিনী কুমার দত্ত তার পিতা ব্রজমোহন দত্তের স্মরণে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। তিনি শুধু নাম দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং প্রায় ১০০ একর বহুমূল্য জমি এবং নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি এই কলেজের উন্নয়নে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।
খুলনা ব্রজলাল (বিএল) কলেজ (১৯০২): জমিদার ব্রজলাল চক্রবর্তী এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত খুলনা অঞ্চলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের প্রথম উন্মুক্ত দ্বার হিসেবে কাজ করেছিল।
ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ (১৯১৮): ফরিদপুরের বিদ্যোৎসাহী জমিদার রমেশ নারায়ণ রায় চৌধুরী তার পুত্র রাজেন্দ্র কুমারের নামানুসারে এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর পেছনে বিপুল সম্পত্তি দান করেন।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯): কুমিল্লার অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় রানি ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে এই স্বনামধন্য কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
৩. ঢাকা ও মধ্যাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
ঢাকা জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় - ১৮৫৮): মানিকগঞ্জের বালিটির বরেণ্য জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তার পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর অমর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৎকালীন সময়ে ৫০ হাজার টাকা নগদ এবং অন্যান্য সম্পদ দান করে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রাচীন বিদ্যালয়সমূহ: ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (১৮৩৫), পোগোজ স্কুল (১৮৪৮) এবং সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনেও হিন্দু জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের ভূমি ও আর্থিক অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ (১৯০৮): কিশোরগঞ্জ জেলার কৃতি সন্তান ও বিশিষ্ট ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু এই বিদ্যাপীঠটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা ময়মনসিংহ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে।
৪. সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল
সিলেট মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ (১৮৯২): সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়ের সুযোগ্য নাতি রাজা মুরারি চাঁদ রায় এই কলেজের জন্য ১০০ একর জমি এবং নগদ ৩ লক্ষ টাকা দান করে এর স্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করেন।
চট্টগ্রাম কলেজ (১৮৬৯): চট্টগ্রামের স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের সম্মিলিত অর্থায়ন ও ভূ-সম্পত্তি দানের মাধ্যমে এই কলেজের গৌরবময় যাত্রা শুরু হয়েছিল।
কুমিল্লা ও নোয়াখালীর হাই স্কুলসমূহ: দত্ত হাই স্কুল, নবীন চন্দ্র স্কুল এবং আর.কে. হাই স্কুলের মতো শত শত ঐতিহাসিক উচ্চ বিদ্যালয় তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের নাম ও দানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
৫. নোয়াখালী, ফেনী ও গাজীপুর জেলার শিক্ষা বিস্তার
নোয়াখালী জেলা: নোয়াখালী জেলা স্কুল, সোনাইমুড়ীর অরুণ চন্দ্র হাই স্কুল এবং চৌমুহনীর প্রাচীন হাই স্কুলগুলোর বহুমূল্য জমি ও সংলগ্ন পুকুর স্থানীয় হিন্দু জমিদার অরুণ চন্দ্র সিংহ রায়সহ অন্যান্য জমিদার পরিবারের পক্ষ থেকে দান করা হয়েছিল। এছাড়া চৌমুহনী ও মাইজদী এলাকার বণিক পরিবারগুলো এসব স্কুলের ভবন নির্মাণে মুক্তহস্তে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন।
ফেনী জেলা: ফেনী সরকারি কলেজের (১৯২২) প্রাথমিক জমি অধিগ্রহণ এবং তহবিল গঠনে ফেনীর খ্যাতনামা হিন্দু জমিদার কালীচরণ নাথ চৌধুরী ও মহেন্দ্রলাল চৌধুরী পরিবার বিপুল জমি প্রদান করেন। এছাড়া ফেনী জি.এ. একাডেমী, পাইলট হাই স্কুল (১৯১১) এবং পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া অঞ্চলের প্রাচীন স্কুলগুলোর মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল স্থানীয় জমিদারদের দানে।
গাজীপুর জেলা: গাজীপুরের সামগ্রিক ইতিহাস মূলত ভাওয়াল রাজবংশের ইতিহাস। ভাওয়ালের রাজা কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী, রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় এবং রাণী বিলাসমণি দেবী এই অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কালীগঞ্জ, জয়দেবপুর ও কাপাসিয়ার প্রায় প্রতিটি পুরোনো মিডল ইংলিশ স্কুল ভাওয়াল রাজ এস্টেট থেকে প্রাপ্ত নিষ্কর জমি, পুকুর এবং বার্ষিক আর্থিক বরাদ্দের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। বিশেষ উল্লেখ্য যে, তারা সেকালেও মুসলমান প্রজাদের সন্তানদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।
৬. জমিদারদের দানের মূল বৈশিষ্ট্য ও রূপ
এই জমিদাররা কেবল কয়েকটি কলেজ বা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, তাদের কার্যক্রমের পরিধি ছিল বহুমাত্রিক:
তারা প্রতিটি জমিদারি এলাকার প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত একটি করে "মিডল ইংলিশ স্কুল" স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পানিপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে বড় বড় পুকুর ও দীঘি খনন করে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের নামে লিখে দিতেন (যেমন বরিশালের বিএম কলেজের ঐতিহাসিক পুকুর)।
সনাতন ধর্মের প্রাচীন সংস্কৃত টোলের পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার আধুনিক বিদ্যালয় চালুর ক্ষেত্রে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অনেক জমিদার সেযুগে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মুসলিম ছাত্রদের জন্য বিশেষ মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যার অন্যতম উদাহরণ রাণী হেমন্ত কুমারী দেবীর অনুদান কার্যক্রম।
সাধারণত প্রচলিত ধারণায় বলা হয়ে থাকে যে সেসময়ে মুসলমানরা শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই পিছিয়ে থাকা মুসলিম সমাজের জন্য আলিয়া মাদ্রাসা ছাড়া আধুনিক শিক্ষার আর কোন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তখন বিদ্যমান ছিল? তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ ও স্কুলগুলোতে শিক্ষাগ্রহণ করেই এই জনপদের প্রথম প্রজন্মের মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের দিকপাল ব্যক্তিত্ব—যেমন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো মহান নেতারা এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ থেকেই নিজেদের শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন।
তাই ইতিহাসের নির্মম ও বাস্তব সত্য হলো—জমিদারি প্রথার রাজনৈতিক ও সামাজিক কুফল হিসেবে নানা অপ্রীতিকর দিক থাকলেও, সেই জমিদারদের আহরিত অর্থের একটি বিরাট অংশ দিয়েই এই পূর্ব বাংলায় আধুনিক শিক্ষার যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা না হলে আজকের বাংলাদেশ শিক্ষা ও জ্ঞানে এতদূর এগোতে পারত না। তাদের কর্ম ও অবদানই আজ ইতিহাসের পাতায় তাদের প্রকৃত পরিচয় হিসেবে টিকে আছে।
— সাবেক সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তা , পরিচালক, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান