যুদ্ধবিরতির সপ্তম দিনে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফররত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই উদ্যোগে চীনের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান শাখা রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বা আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মোহেবি এএফপিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে ইয়েমেনে চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানোও তেহরানের অন্যতম প্রধান এবং অপরিহার্য দাবি। চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের চিরতরে অবসান ঘটানো, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং দেশের সংবেদনশীল পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত বন্ধ থাকা আলোচনা নতুন করে আবার শুরু করার লক্ষ্যে গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেই চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কিছুদিন পরেই তা বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। ওই চুক্তির বরখেলাপের পর হরমুজ প্রণালীতে নির্ধারিত ও অনুমোদিত রুট থেকে বিচ্যুত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলে ইরান বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে আকস্মিক হামলা চালায়।
দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করার স্বার্থে যেকোনো বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের আগে তেহরানের সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে ইরান। এই কঠোর নির্দেশ অমান্যকারী জাহাজগুলোকে তারা নিয়মিতভাবে তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আসছে। এর বিপরীতে মার্কিন সামরিক বাহিনীও আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে প্রায়ই ইরানের উপকূলীয় ও সংবেদনশীল বিভিন্ন এলাকায় তীব্র বিমান ও বোমা হামলা চালিয়ে আসছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই চরম রূপ ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের বর্তমান বৈঠকের প্রাক্কালে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বিরাট অংশের জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়ে থাকে, ফলে এই প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান এই অচলাবস্থা নিরসনে তেহরানের উত্থাপিত প্রস্তাব এবং বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সমর্থন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন এই প্রস্তাবের জবাবে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।