ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান হুমকি সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সর্বাধুনিক লেজার প্রযুক্তির অস্ত্র মোতায়েন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধক্ষেত্রের রূঢ় বাস্তবতায় ব্যবহারের উপযোগী করে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০ কোটি ডলারের একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শত্রু পক্ষের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই লেজার প্রযুক্তির। সম্প্রতি ইরানের আকাশসীমায় এক অদ্ভুত চোখধাঁধানো লেজার আলোর দৃশ্য দেখতে পাওয়া গেছে, যা কোনো বিনোদনমূলক বা উৎসবের আলোকসজ্জা নয়। খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে লেজার প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ধ্বংস করছে বলে নিশ্চিত করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে লেজার প্রযুক্তি উন্নয়নের এই কর্মসূচি প্রায় পাঁচ দশকের পুরোনো হলেও বর্তমান সক্ষমতার বিচারে এই ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা ‘ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টস’-এর প্রেসিডেন্ট মার্ক নাইস ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, নির্দিষ্টভাবে কোনো ড্রোন বা শত্রু পক্ষকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে সেটিকে সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা সম্ভব। এরপর লেজার রশ্মি প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করে ড্রোনের মূল সেন্সরগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর করা কিংবা আস্ত ড্রোনটিকেই মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব হয়।
লেজার অস্ত্রের মূল কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা জানান, জেনারেটর বা শক্তিশালী ব্যাটারি থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎশক্তিকে ফোটনে রূপান্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে তা একটি শক্তিশালী একক রশ্মিতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। খালি চোখে এই অদৃশ্য রশ্মি দেখা যায় না, তবে ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে এটি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট অংশে একটানা নির্দিষ্ট সময় ধরে এই রশ্মি ধরে রাখলে তীব্র তাপ উৎপন্ন হয়, যার ফলে লক্ষ্যবস্তু নিমেষেই গলে যায় বা বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, অত্যাধুনিক এই সামরিক প্রযুক্তির কিছু জটিল ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনার জন্য মার্কিন সেনারা পুনর্বিন্যাস করা ‘এক্সবক্স’ ভিডিও গেম কনসোলের কন্ট্রোলার ব্যবহার করছেন। ভিডিও গেম শিল্প দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে যেভাবে কার্যকর ও ব্যবহারবান্ধব কন্ট্রোলার তৈরি করেছে, তাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী মনে করছে নতুন করে আলাদা কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির কোনো প্রয়োজন নেই। এমনকি জনপ্রিয় গেম ‘হ্যালো’-তে স্পার্টান লেজার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন যে কেউ বাস্তব জীবনের এই মারণাস্ত্রও খুব সহজেই পরিচালনা করতে পারবেন। পরীক্ষাগারের নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মাঠে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের সময় এখনই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া মেক্সিকো সীমান্ত এলাকার মাদক চক্রের পাঠানো ড্রোন ভূপাতিত করতেও এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডার’ মেক্সিকোর মাদক কারবারিদের পাঠানো ড্রোন ধ্বংস করার কাজে এই লেজার ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১টি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথও লেজার অস্ত্রের এই অভূতপূর্ব প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত জুনে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে আয়োজিত লেজার অস্ত্রের এক বিশেষ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে তিনি নিজেই হাতে কন্ট্রোলার নিয়ে ড্রোন ভূপাতিত করার প্রশিক্ষণ নেন। তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যেমন কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পরিষ্কার আকাশের প্রয়োজন হয় এবং একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বিত বা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ মোকাবিলায় এর সক্ষমতা কিছুটা সীমিত। তা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রের চিরাচরিত কৌশল ও সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় এই লেজার প্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।