পর্তুগালে জনসমাগমস্থলে মুখ ঢেকে চলাচল নিষিদ্ধ করার অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত নতুন আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশজুড়ে এই আইন কার্যকর করা হয়েছে, যা লঙ্ঘন করলে অপরাধের মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত কঠোর জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
যদিও দেশটির সংসদে দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কের সময় এই আইনটি সাধারণ মহলে ‘বোরকা আইন’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল, তবে চূড়ান্তভাবে পাস হওয়া আইনি নথিতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা বিশেষ ধর্মীয় পোশাকের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং জনসমক্ষে যেকোনো উপায়ে মুখ পুরোপুরি ঢেকে রাখাকেই আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নতুন এই আইন অনুযায়ী, দেশটির রাস্তাঘাট, পার্ক, সরকারি দপ্তর, বিভিন্ন উন্মুক্ত অনুষ্ঠান এবং আন্দোলন বা জনসমাগমস্থলে কোনো ব্যক্তি তার মুখ পুরোপুরি ঢেকে রাখতে পারবেন না। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক অসুস্থতা, পেশাগত সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন, শিল্প-সংস্কৃতি বা বিজ্ঞাপনের কাজ এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা বা প্রতিকূল আবহাওয়া জনিত কারণে মুখ ঢাকার যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা। এছাড়া ধর্মীয় উপাসনালয়, বিমান ও বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোও এই কঠোর আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
আইন অমান্যের ক্ষেত্রে অপরাধটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে নাকি অনিচ্ছাকৃত, তা খতিয়ে দেখে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। যদি কেউ অসাবধানতাবশত বা অজ্ঞতাবশত আইন লঙ্ঘন করেন, তবে তাকে ১৫০ থেকে ৭৫০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। অন্যদিকে, কেউ যদি জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করেন, তবে তার ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে ৪০০ থেকে ৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। স্থানীয় পুলিশ প্রথমে সম্পূর্ণ ঘটনার একটি সুনির্দিষ্ট নথি বা রিপোর্ট তৈরি করবে এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি জরিমানার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
আইনটিতে কেবল মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করাই নয়, বরং অন্য কোনো ব্যক্তিকে জোর করে বা বলপ্রয়োগ করে মুখ ঢাকতে বাধ্য করাকেও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ভীতি প্রদর্শন, হুমকি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে মুখ ঢাকতে বাধ্য করলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা কঠোর অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি এই অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর বয়স যদি ১৮ বছরের কম হয়, তবে তার শাস্তি আরও এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আইনি বিধান রাখা হয়েছে।
পর্তুগাল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মূলত দেশের সাধারণ জনগণের সামগ্রিক জননিরাপত্তা এবং সমাজে সামাজিক সংহতি সুনিদৃঢ়ভাবে বজায় রাখার মহৎ উদ্দেশ্যেই এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক এবং দেশের জনগণের বিভিন্ন মতামতের পর গত আগস্ট মাসে পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট এই আইনটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পর্তুগাল নিউজ’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।