কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুনির্দিষ্ট মুক্তির দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ইসলামাবাদে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ডাকা পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মসূচি প্রতিহত করতে ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাকে কার্যত লকডাউন করে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বড় বড় শিপিং কনটেইনার বসিয়ে যাতায়াত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে জানানো হয়েছে যে, যত বাধাবিপত্তিই আসুক না কেন, তারা তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো দীর্ঘ সময় ধরে দখল করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বা জনজীবন ব্যাহত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ হাইকোর্টও একটি ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, দেশের কোনো রাজনৈতিক দলেরই রাজধানীর সড়ক, মহাসড়ক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা জবরদখল করে রাখার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি অধিকার নেই। এই কঠোর অবস্থানের ফলে বর্তমান সরকার এবং ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে।
এদিকে ২৭ সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু হয়েছে। বিক্ষোভ মিছিল শুরু হওয়ার আগেই কারাবন্দি ইমরান খানের তিন বোন—আলিমা খান, উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকে পুলিশ প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনে আটক করেছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন এবং মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে তাদের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের জন্য আটক রাখার কঠোর প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে। এছাড়া পিটিআইয়ের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে বলে দলটির পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশের সার্বিক জনশৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পিটিআই এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অবিলম্বে আটক ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, পিটিআইয়ের এই ঘোষিত মিছিলে আনুমানিক ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার সাধারণ মানুষ ও কর্মী অংশ নিতে পারেন বলে গোয়েন্দা আশঙ্কা রয়েছে। এই বিশাল জনস্রোত ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যদের থাকার সুবিধার্থে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানে সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তাদের ৭০০ কোটি ডলারের বিশাল ঋণ কর্মসূচির মূল্যায়নে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচির ঠিক পরদিন আইএমএফ প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদে যাওয়ার কথা রয়েছে। রাজধানীর বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকে, তবেই আইএমএফের পূর্বনির্ধারিত কার্যক্রম নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সচল থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে দুর্নীতির বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। চলমান রাজনৈতিক অচলায়ব এবং ২৭ সেপ্টেম্বরের এই সংঘাতপূর্ণ কর্মসূচি ঘিরে গোটা পাকিস্তানজুড়ে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।