ভারতের হরিয়ানার ঝাজ্জার জেলার একটি জমকালো খামারবাড়িতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বসেছিল এক ব্যতিক্রমী বিয়ের আসর। প্রায় ৫০০ জন সম্মানিত অতিথির জন্য সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয় বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। তবে সাধারণ বিয়ের মতো এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটেনি; বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর নববধূকে সঙ্গে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি বর। বিয়ের জন্য মাত্র ১২ ঘণ্টার বিশেষ প্যারোলে মুক্তি পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ায় রাত ৮টার মধ্যেই তাকে পুনরায় কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে ফিরে যেতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলোদ্ভেদী তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বর মাইনপাল ধিল্লা (যিনি স্থানীয়ভাবে মাইনপাল বাদলি নামেও পরিচিত) একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি। জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে আইনগত প্রক্রিয়া মেনে বিয়ের উদ্দেশ্যে আদালতের বিশেষ আদেশে নির্দিষ্ট সময়ের এই প্যারোল বা মুক্তি লাভ করেছিলেন তিনি।
তার অর্ধাঙ্গিনী বা কনে কম্বোডিয়ার নাগরিক মেটা চানমিয়া। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় এই দম্পতির প্রথম পরিচয় হয়। পরবর্তীতে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘ সময় তারা একসঙ্গে জীবনযাপন করেন। এই দম্পতির ঘরে ইতোমধ্যে তিনটি সন্তানও রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তারা কম্বোডিয়ার বিখ্যাত পর্যটন শহর সিয়েম রিপে অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন।
বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ঝাজ্জারের পুলিশ সুপার সিমারদীপ সিং গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, পুরো অনুষ্ঠানস্থলের চারপাশে প্রচুর পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। খামারবাড়িতে প্রবেশকারী প্রতিটি ব্যক্তির কঠোর তল্লাশি চালানো হয় এবং আমন্ত্রিত অতিথি ও নিকটাত্মীয়দের চলাফেরার ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যমকর্মীকে অনুষ্ঠানস্থলের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ঝাজ্জার জেলার বাদলি গ্রামের বাসিন্দা মাইনপাল ধিল্লা ২০০৭ সালে বাহাদুরগড় থানায় দায়ের করা হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কারা কর্তৃপক্ষের নথিপত্র অনুযায়ী, আরও দুটি পৃথক অপরাধমূলক মামলায়ও তার সাজা হয়েছিল।
এর আগে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে হিসার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি ছয় সপ্তাহের একটি প্যারোল পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগের অপব্যবহার করে তিনি আর সময়মতো কারাগারে ফিরে আসেননি। কর্তৃপক্ষের জোরালো দাবি, ওই বছরের আগস্ট মাসে সম্পূর্ণ জালিয়াতি ও ভুয়া পরিচয়ের আশ্রয় নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। দীর্ঘ তল্লাশির পর কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ করা হলে তিনি পুনরায় কারাবন্দি হন। পূর্বে একবার প্যারোল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস থাকায় এবারের বিয়ের অনুমতির ক্ষেত্রে আদালত ও প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর শর্ত এবং নিরাপত্তা বলয় বজায় রেখেছিল।