ফরিদপুর প্রতিনিধি
স্বামীর দীর্ঘ প্রবাস জীবন ও পারিবারিক কলহের জেরে জমে থাকা তীব্র অভিমান থেকে নিজের শিশুপুত্রকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার চেষ্টার এক লোমহর্ষক ঘটনা সামনে এসেছে। এই পৈশাচিক ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর দেশজুড়ে চরম চাঞ্চল্য ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত জন্মদাত্রী মাকে হাতেনাতে আটক করেছে। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীসহ দুই শিশুকে উদ্ধার করে নিজেদের নিরাপদ হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওর দৃশ্য দেখে দেশজুড়ে মানুষের হৃদয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়; যেখানে দেখা যায়, এক নারী তার নিজের ছোট শিশুপুত্রকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যার চেষ্টা করছেন। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নগরকান্দা থানা পুলিশের একাধিক বিশেষ দল এর প্রকৃত উৎস ও সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নামে। এর মাঝেই শিশুটির ফুফু সরাসরি থানায় ফোন করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলে পুলিশের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়।
তৎক্ষণাৎ নগরকান্দা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল রামনগর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে ২৮ বছর বয়সী অভিযুক্ত নারী বিথী আক্তারকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। একই সঙ্গে পুলিশ তার ৯ বছর বয়সী বড় ছেলে আবীর এবং ৭ বছরের ছোট ছেলে তাবিরকে উদ্ধার করে নিজেদের নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে আসে। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা এমন অমানবিক আচরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক বিথী আক্তার এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্য কারণ খোলাসা করেছেন। তিনি জানান যে, তার স্বামী আব্বাস আলী বিগত দীর্ঘ সাত বছর ধরে মালদ্বীপে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন এবং নানা অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে দেশে আসছেন না। স্বামীর এই দীর্ঘ প্রবাস জীবন, পারিবারিক দূরত্ব এবং অবহেলার কারণে তার মনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম মানসিক অভিমান দানা বেঁধেছিল। স্বামীর প্রতি সেই গভীর ক্ষোভ ও অভিমান থেকেই তিনি নিজের সন্তানকে গলায় ফাঁস দেওয়ার এই ভয়াবহ দৃশ্য ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং তা ক্ষোভের বশে স্বামীর কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ সাংবাদিকদের জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অভিযুক্ত মাকে আটক করেছে। পাশাপাশি দুই শিশুকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদে হেফাজতে রাখা হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো গভীর পারিবারিক জটিলতা, মানসিক অবসাদ কিংবা অন্য কোনো কারণ জড়িত আছে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খতিয়ে হচ্ছে। অভিযুক্ত নারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটকে আবারও প্রকট করে তুলেছে।