জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ফোরামে অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের চার দিনের অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ঐতিহাসিক সফরে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরপরবর্তী সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত ব্যস্ততাপূর্ণ সফরে প্রধানমন্ত্রী সর্বমোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। এর মধ্যে ১১টি বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বা কর্মপরিকল্পনায় অংশগ্রহণ, ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান এবং একটি ঐতিহাসিক মূল ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এই চার দিনের মধ্যে প্রায় ৫০টি পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে সফল প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে, যা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ৩০টি মূল কর্মসূচির মধ্যে আটটি সরাসরি জাতিসংঘের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে অংশগ্রহণ এবং সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নারী, তরুণ সমাজ, যুবক, শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নতুন করে পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি ‘থ্রি-আর’ বা ‘রিকভার, রিস্টোর ও রিকনস্ট্রাক্ট’ নীতির বিশেষ ধারণা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করেন। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ইউনিভার্সাল কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির রূপরেখাও বিশ্বমঞ্চে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত দুটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে জোরালো ভূমিকা পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। ‘হাই লেভেল মিটিং অন ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন’ এবং ‘হাই লেভেল মিটিং অন সি লেভেল রাইজ’ শীর্ষক কর্মশালায় বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গঠন এবং ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’কে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা হয়। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে মিডওয়াইফারি, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং আগামী দিনে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগের যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী, যার ৮০ শতাংশই নারী রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের সাইড ইভেন্টে প্রায় ২০টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, সংকটের মূল কেন্দ্র মিয়ানমারে হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একযোগে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। একদিকে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিশ্বের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, রোবটিকস এবং একটি টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।