দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এর মারাত্মক প্রকোপ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। মশাবাহিত এই ভয়াবহ রোগের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মহল যখন হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই দেশজুড়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৮ জন ডেঙ্গুরোগী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অর্থাৎ গত কয়েক মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৫ জনে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত মোট ৭৯ হাজার ৬২০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হয়েছেন। তবে চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসার ফলে এর মধ্যে মোট ৭৩ হাজার ৮৯০ জন ডেঙ্গুরোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন বিভাগে নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ভয়াবহতার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৪৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩২০ জন, খুলনা বিভাগে ২৪৮ জন, রাজশাহী বিভাগে ২১১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ২১০ জন, বরিশাল বিভাগে ২১২ জন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৮৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১০২ জন, রংপুর বিভাগে ৯৯ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ শুরু করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিগত বছরগুলোর তুলনামূলক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি প্রতি বছরই মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। এর আগে বিগত ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪১৩ জন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৭৫ জন। তবে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল; ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী।
এদিকে ডেঙ্গুর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে আরও চার শিশুর প্রাণহানির মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আরও বেশি সতর্ক ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, বর্ষাকাল ও এর পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে এবং ঘরবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রগুলো অবিলম্বে ধ্বংস করতে হবে।