চূড়ান্ত
সরকারি গেজেট থেকে নাম বাদ পড়ার গভীর অভিমান ও হতাশা থেকে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতির ঘোষণা দিয়েছেন এক তরুণ মেধাবী
শিক্ষার্থী। বহু কাঙ্ক্ষিত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ ৪৯তম বিসিএসের
(বিশেষ) সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও চূড়ান্ত তালিকায় নিজের নাম না থাকায় এই
নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কয়েকটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘ পোস্টের
মাধ্যমে নিজের চরম ক্ষোভের কথা প্রকাশ করে এই আত্মঘাতী পদক্ষেপের
বার্তা দেন ওই চাকরিপ্রার্থী। তার
এই ব্যতিক্রমী ও হৃদয়বিদারক ঘোষণায়
পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সচেতন মহলে গভীর উৎকণ্ঠা ও আলোচনার ঝড়
উঠেছে।
হতাশায়
আত্মাহুতির হুমকি দিয়ে চরম এই ঘোষণা দেওয়া
ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. জসিম উদ্দীন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী কবি জসীমউদ্দীন হলের নিয়মিত আবাসিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও লড়াইয়ের পর
৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি গেজেটে নিজের নাম দেখতে না পেয়ে গত
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তিনি
ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার এই সিদ্ধান্ত কেবল
ব্যক্তিগত হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার
জটিলতার বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব
বিদ্রোহ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ স্ট্যাটাসে জসিম ২০১১ সালের ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্তের’ সেই মর্মান্তিক ও বিপ্লব সৃষ্টিকারী
পটভূমি স্মরণ করেন। তিউনিসিয়ার সাধারণ যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজির আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন, ‘সময়টা ২০১০ সালের ডিসেম্বর, তিউনিসিয়ার যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নে শেষ পর্যন্ত শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মাহুতি দিলেন। তার জীবনের বিনিময়ে পুরো আরব বিশ্বে বেশ পরিবর্তন এসেছিল। আজ থেকে সে
আমার আইডল।’ তিউনিসিয়ার সেই যুবকের জীবনাবসানের ঘটনাকে নিজের বর্তমান মানসিক অবস্থার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এই চরম পথ
বেছে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
নিজের
আত্মাহুতির দিনতারিখ ও স্থান পরিষ্কার
করে জসিম ফেসবুক পোস্টে আরও লেখেন, ‘৪৯তম বিসিএসের যোগদানের নির্ধারিত দিন (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আমিও শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মাহুতি দেওয়ার ঘোষণা দিলাম। আমার জীবনের বিনিময়ে হয়তো কিছুই অর্জিত হবে না; কিন্তু ভেরিফিকেশন নামক হয়রানি এবং গেজেটের দাসত্ব থেকে এই জাতির মেধাবী
সন্তানরা মুক্ত হোক, সেই কামনা রইল।’ তার এই বক্তব্যের মধ্য
দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের পুলিশ ভেরিফিকেশন বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের
নামে চলা হয়রানি ও মানসিক যন্ত্রণার
দিকটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পরবর্তী
সময়ে দেওয়া আরেকটি ফেসবুক পোস্টে জসিম নিজের অতীত কর্মকাণ্ড, ছাত্রজীবন ও রাজনৈতিক সংশ্লেষের
বিষয়গুলো সামনে এনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রশ্নবিদ্ধ নীতিমালা
নিয়ে প্রশ্ন রেখে লেখেন, ‘জুলাই ২০২৪-এ শাহবাগ স্কয়ারে
থাকা অযোগ্যতা? ২০২২ সালে হল ছাত্রলীগে পোস্টেড
ছিলাম সেটা আমার অযোগ্যতা? ফৌজদারি মামলা কিংবা মামলা-হামলায় জড়িত ছিলাম না, সেটা আমার অযোগ্যতা?’ এই সাহসী ও
প্রশ্নবোধক বার্তার মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নিয়োগ প্রক্রিয়ার নানা অসংগতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তার এই ঘোষণা এখন
সর্বমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।