জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কব্জায় বন্দি করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা। তাঁর স্পষ্ট দাবি, আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে সুকৌশলে মাইনাস করে এককভাবে ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির লোকজনদের নিয়ে সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আর এই কোরামবাজির সুযোগেই গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহু অপরিচিত ও সুবিধাবাদী মুখ এসে ক্ষমতার ময়দানে সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের ছাত্রশিবিরের ‘সাথি’ পদ বাতিলের বিষয়টির উল্লেখ করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিস্ফোরক পোস্টে এই মন্তব্য করেন উমামা ফাতেমা। তাঁর মতে, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক বা ন্যূনতম সম্পৃক্ততা না থাকা ব্যক্তিরাও হঠাৎ উড়ে এসে আন্দোলনের নেতা বনে গেছেন, যার জ্বলন্ত উদাহরণ সালাউদ্দিন আম্মার।
পোস্টে জুলাই আন্দোলনের পেছনের অন্দরের চিত্র তুলে ধরে উমামা ফাতেমা লেখেন, সব রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনকে দূরে সরিয়ে রেখে কেবল শিবির ও গুপ্তশিবির বা ছাত্রশক্তির লোকজনকে কোরামের মাধ্যমে সমন্বয়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতেই আজ ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ‘যদু-মধু-কদু’ টাইপের লোকজন এসে সবকিছু দখল করে নিয়েছে এবং নেতৃত্বকে নিজেদের একক স্বার্থে ব্যবহার করছে। পুরো আন্দোলনটিকে ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম ও শিবিরের হাতে বন্দি’ করা হয়েছিল বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক এই সমন্বয়ক বলেন, দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ম্যানিপুলেশন’ বা প্রোপাগান্ডা এখন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্দার আড়ালে থাকা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাইয়ের নামে ‘ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট’ বা কৃত্রিম জনমত তৈরি করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক উদাসীনতা ও হুজুগে মনোভাবের সুযোগ নিয়ে রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজনকে হিরো এবং পরের দিন আরেকজনকে আইডল বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার সময় ফেসবুক যেভাবে অত্যন্ত কার্যকর ও ধ্বংসাত্মক টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, বাংলাদেশেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব তেমনি এক বড় আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের একেবারে শেষ পর্যায়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন উমামা ফাতেমা। তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক যাত্রাপথ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের রাজনীতির ইতিহাসকে বারবার ব্রিটিশ আমল থেকে নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। অত্যন্ত কড়া ভাষায় তিনি দাবি করেন, আদর্শগত বা কার্যকারিতার দিক থেকে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ ও ‘গণহত্যার কালিমা’ থেকে নিজেদের মুখ রক্ষা করতে জামায়াত যেকোনো চরম পর্যায়ে পৌঁছাতেও দ্বিধাবোধ করছে না বলে অভিযোগ তোলেন সাবেক এই ছাত্রনেত্রী।