প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে সৃষ্ট অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী শীত মৌসুমেও বাংলাদেশে তীব্র গরম ও চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, এর প্রভাবে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে দেশে ছয় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। তবে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই মডেলভিত্তিক পরিসংখ্যানকে সরাসরি নিশ্চিত মৃত্যু হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদী সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো তার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে পারে এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানিয়েছে, ১৯৫০ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো। এর ফলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন মারাত্মকভাবে পাল্টে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম, খরা কিংবা স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী এই এল নিনোর জেরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে অতিরিক্ত তাপে ছয়শতাধিক মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু খুলনা অঞ্চলেই প্রায় ৩১০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা মডেলটিতে দেখানো হয়েছে। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে এটি কোনো নিশ্চিত মৃত্যুর পূর্বাভাস নয়, বরং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর একটি পরিসংখ্যানিক মডেলভিত্তিক হিসাব মাত্র।
এই আশঙ্কার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে বিশিষ্ট জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়লেও বাংলাদেশে এই মাত্রায় মৃত্যুর শঙ্কা অবাস্তব ও অতিরঞ্জিত মনে হয়। তিনি জানান, এল নিনো ও লা নিনো আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনলেও সরাসরি তা থেকে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট হিসাব মেলানো সম্ভব নয়। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিকও এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে জানান, এল নিনোর প্রভাবে শীতের স্থায়িত্ব কমতে পারে এবং গরমের অনুভূতি বাড়লেও ঢালাওভাবে মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান সঠিক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসলেও হাসপাতালে এর কোনো নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট ডেটা বা পরিসংখ্যান থাকে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্য অতিরিক্ত গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে হালকাভাবে নিতে নারাজ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী জানান, তীব্র গরমে বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং রিকশাচালক ও নির্মাণশ্রমিকদের মতো খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া রাস্তার খোলা শরবত বা অস্বাস্থ্যকর পানীয় পরিহার করে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিভাগের প্রধান কারেফ রাফিসুরা সতর্ক করে বলেছেন, মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা নতুন রেকর্ডে পৌঁছানোর কারণে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।