মাসের শুরুর এই প্রথমাংশে সরকারি চাকরিজীবীদের অলিখিত নিয়ম হলো বারবার মোবাইল ফোনের ইনবক্স বা ব্যাংকের নোটিফিকেশনের দিকে তাকিয়ে থাকা। তবে সদ্য ঘোষিত নবম পে স্কেলের কারণে এবারের প্রতীক্ষা আর দশটা সাধারণ মাসের চেয়ে অনেকটাই আলাদা ও রোমাঞ্চকর। গত ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে কাঙ্ক্ষিত সেই বর্ধিত অঙ্কের অর্থ। তবে বর্তমান সেপ্টেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন স্কেলের বাড়তি টাকা যোগ হচ্ছে না জেনে কিছুটা হতাশ হতে পারেন তাঁরা। মূলত প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার কারণে এই সামান্য বিলম্ব ঘটছে।
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হলেও নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক সুফল সরাসরি এই মাসের বেতনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না। অক্টোবরের মূল বেতন নতুন স্কেলে হিসাব করা হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীরা এই বর্ধিত অর্থ হাতে পাবেন মূলত নভেম্বরের প্রথমাংশে। নতুন এই পে-স্কেলের বাড়তি বেতন গ্রহণের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ধাপ হলো নির্ভুলভাবে পে-ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করা। যেকোনো ধরনের তথ্য ভুল, অসম্পূর্ণ বা পূর্ববর্তী রেকর্ডের সঙ্গে অমিল থাকলে এই পুরো প্রক্রিয়াটি মাঝপথেই আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এছাড়া বিভাগওয়ারিভাবে আগামী ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে।
পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়া সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পরই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ ছাড়ের পথ উন্মুক্ত হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হিসাব সম্পন্ন হওয়ার পর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বকেয়া বা এরিয়ার একসঙ্গে পরিশোধ করার ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে মনে রাখতে হবে যে, প্রত্যেকের বকেয়ার পরিমাণ সম্পূর্ণ এক হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্দিষ্ট গ্রেড, পূর্বের মূল বেতন, নতুন স্কেলে নির্ধারিত বেতন এবং কার্যকর তারিখের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট নিয়মে এই বকেয়ার হিসাব করা হবে। অনলাইন প্রক্রিয়ায় কোনো চাকরিজীবীর তথ্য এন্ট্রি করতে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়ার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন এই বেতন কাঠামোতে সরকারের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ধাপে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতনের অতিরিক্ত ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে বাড়তি অর্থ পাবেন, যা গত ৩০ জুন আহরিত মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে এই বেতন বৃদ্ধির শতভাগ শতভাগ কার্যকর হবে।
এছাড়া ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আওতাধীন অন্যান্য সকল ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া শুরু করবেন সরকারি কর্মচারীরা। একই সঙ্গে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতন কাঠামোর যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার আওতায় আসবেন। নতুন এই বেতন কাঠামোতে প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং এগারোতম থেকে বিংশ গ্রেডের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সংস্থান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ভাতাও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আকাশজমিন / আরআর