বর্ষা মৌসুমের রেশ কাটতে না কাটতেই সারা দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এর ভয়াবহতা এখন এক চরম জনস্বাস্থ্য সংকটের রূপ নিয়েছে। বাসাবাড়ি ও চারপাশের জমে থাকা নোংরা পানিতে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতার অনুপস্থিতির কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল, যা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক ও নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বুলেটিনে প্রকাশিত রোমহর্ষক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সারা দেশে মশাবাহিত এই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জন দুর্ভাগ্যজনক রোগীর প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে চিকিৎসাধীন হওয়ার জন্য ছুটে এসেছেন ১ হাজার ৬০৮ জন ডেঙ্গুরোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর রাজধানীসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষের মনে ডেঙ্গু আতঙ্ক আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করা ছয়জন রোগীর মধ্যে দুজন সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের সংরক্ষিত দীর্ঘমেয়াদি হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২৪৯ জন মানুষ। এর মধ্যে কেবল বিদায়ী সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু তার সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিল, যে একক মাসে মারা গেছেন ১৪৮ জন রোগী। এছাড়া বছরের অন্যান্য মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে ৪৩ জন, জুলাই মাসে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং বছরের শুরুর দিকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে ডেঙ্গুরোগীর মর্মান্তিক মৃত্যুর রেকর্ড নথিভুক্ত হয়েছিল। পরিসংখ্যানের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, বছরের বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে।
এদিকে শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক ১ হাজার ৬০৮ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৩শ ৬৯ জনে। তবে কেবল নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যাই বাড়ছে না, বরং চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যা ও সঠিক চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার হারও যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ১ হাজার ৬২১ জন রোগী। সবমিলিয়ে চলতি বছরে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে নিজ গৃহে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৮ হাজার ৪শ ৮২ জনে।
বিভাগভিত্তিক রোগী ভর্তির সাম্প্রতিক ও বিস্তারিত চিত্র বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই ডেঙ্গুর ভয়ংকর বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় একক বিভাগ হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, যেখানে কেবল এই এক বিভাগেই ৫২৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বন্দরনগরী ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৯ জন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগে ২৭৬ জন, দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগে ২১৫ জন, উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিভাগে ১৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬২ জন নতুন ডেঙ্গুরোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
দেশের শহর থেকে শুরু করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ডেঙ্গুর এই লাগামহীন প্রকোপ রোধ করতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে মশা নিধন কার্যক্রমে আরও অনেক বেশি গতিশীল ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো সঠিক রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন চিকিৎসাবিদেরা।