দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মেগা ও রূপান্তরমূলক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার অন্তিম ধাপে পৌঁছেছে। নানা ধাপ পেরিয়ে সবশেষ নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত ক্লাবে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ করার ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত কারিগরি কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বা ফিশন প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা কিছুটা পিছিয়ে গেলেও বর্তমানে কাজের গতি সন্তোষজনক। গত সপ্তাহে প্রথম ইউনিটের ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। খুব শিগগির আরও উচ্চ চাপে অর্থাৎ ১৮ মেগাপ্যাসকেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে মত প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, চুল্লিপাত্রের স্বাভাবিক চাপ ১৬ মেগাপ্যাসকেল এবং এই পরীক্ষা সফল হওয়ার অর্থ হলো প্ল্যান্টটি সচল রাখা সম্ভব। তবে উচ্চ চাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ১৮ মেগাপ্যাসকেলের পরীক্ষাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
এদিকে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ও মজুত নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। প্রথম ইউনিটের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আগেই দেশে এসে পৌঁছেছে এবং গত শুক্রবার রাতে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় অতিরিক্ত একটি চালানও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে গেছে। এছাড়া আগামী বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান দেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি অ্যাসেম্বলির ধারাবাহিক সচলতা বজায় রাখতে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অতিরিক্ত জ্বালানি আগে থেকেই মজুত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, সামান্য একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম কিছুটা পেছালেও বর্তমানে সব কাজ সঠিক পথেই এগোচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো শেষ হলেই খুব দ্রুত তাপশক্তি উৎপাদন শুরু হবে। এই তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। উৎপাদন শুরুর পর একটানা ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই বিশাল প্রকল্পে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে। সমস্ত প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।