নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন ও সুশাসন সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ে দেশজুড়ে ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস ২০২৬’। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার অভিজাত প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটির তাৎপর্য সমগ্র জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। ‘নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত হবে সুশাসন’—এই সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের প্রতিটি জন্ম ও মৃত্যুর নিখুঁত তথ্য সংরক্ষণ এবং এর মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নানা দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের মূল পর্বে বক্তারা জোরালোভাবে বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যতম মৌলিক ও অপরিহার্য দায়িত্ব। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নিখুঁত ডেটাবেজ নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সুশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই প্রচলিত ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, ত্রুটিমুক্ত ও জনবান্ধব করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এই আয়োজনে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এমপি। তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে তিনি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বিভিন্ন কারিগরি, প্রশাসনিক ও সামাজিক দিক তুলে ধরে জানান যে, বর্তমান সরকার নাগরিক সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্তভাবে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান থাকলে সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনা শতভাগ নির্ভুলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য, অবহেলা বা প্রশাসনিক ত্রুটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টা একান্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি ও বক্তব্য প্রদান করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) সচিব মিজ ফারাহ শাম্মী, এনডিসি, ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ড. মিখাইল ক্রেজা এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি মিজ জিলিয়ান মেলসপ। আন্তর্জাতিক অংশীদার ও দেশীয় উচ্চপদস্থ এই বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সরব উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক অনন্য ও আন্তর্জাতিক মাত্রা লাভ করে। তাঁরা সকলেই জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের ডিজিটাইজেশন এবং আধুনিক তথ্য ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা বজায় রাখতে সার্বিক সহযোগিতার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সুযোগ্য সচিব মো. শহীদুল হাসান। তাঁর সমাপনী ভাষণে তিনি বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা আনতে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং এবং তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে একাধিক যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই জনগুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটি সফল ও সার্থক করে তুলতে সরকারি বিভিন্ন মূল দপ্তরের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি একাধিক স্বনামধন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে যৌথভাবে সহযোগিতা করেছে ই-গভর্ন্যান্স এজেন্সি (eGA), ব্রিটিশ কাউন্সিল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইসিটি বিভাগ ও ইউনিসেফ। এসব প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ, কারিগরি সহায়তা এবং অংশীদারিত্বের কারণে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও বেশি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হয়ে উঠবে বলে জোরালো আশা প্রকাশ করেন উপস্থিত বক্তারা।
পরিশেষে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্ব কেবল প্রশাসনিক রেকর্ড বা ফাইলবন্দী রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের আইনি অধিকার সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা বিধানের প্রধান হাতিয়ার। আজকের এই জাতীয় দিবসের আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মূল্যবান দিকনির্দেশনা ও সুপারিশগুলো আগামী দিনে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও যুগোপযোগী করতে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।