মানবতাবিরোধী
অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের
রায় থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী
হাসানুল হক ইনু। বুধবার
(১৪ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় তাঁর পক্ষে এ আপিল করা
হয়। তাঁর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ বিষয়টি জানিয়েছেন। এর আগে একই
মামলায় ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হয়েছে।
গত
৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুকে ১০
বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁর বিরুদ্ধে
আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ দণ্ড দেওয়া
হয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলো
থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের
রায়ে বলা হয়, ইনুর বিরুদ্ধে ৩, ৬ ও
৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগে তাঁকে ১০ বছর করে
সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনটি সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় তাঁকে মোট ১০ বছর কারাগারে
থাকতে হবে।
রায়ে
রাইসুল হকসহ অন্য ভুক্তভোগীদের গুরুতর আহত করা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের দায়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এসব অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারায়
তাঁকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ
ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও অপরাধ সংঘটনে
সহযোগিতার অভিযোগেও ইনুকে দণ্ডিত করা হয়। এসব অভিযোগের কয়েকটিতে ১০ বছরের সশ্রম
কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা
করে জরিমানা করা হয় বলে রায়ের
বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
তবে
ইনুর বিরুদ্ধে আনা ১, ২, ৪,
৫ ও ৮ নম্বর
অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল
তাঁকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস দেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে এবার নিজের দণ্ড বাতিল করে সম্পূর্ণ খালাস চেয়ে আপিল করলেন সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী।
এর
আগে একই মামলায় তাঁর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হয়েছে। ফলে দণ্ডের বিরুদ্ধে ইনুর আপিল এবং সাজা বাড়ানোর আবেদন—দুই বিষয়ই এখন উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত
ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আবেদনগুলোর বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
মামলায়
ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযোগগুলোর কয়েকটি ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
প্রথম
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয়
একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে
আখ্যা দেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা এবং
হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়।
দ্বিতীয়
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণভবনে ১৪-দলীয় জোটের
সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় উপস্থিত
থেকে ইনু সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা,
প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেছিলেন
বলে অভিযোগ করা হয়।
তৃতীয়
অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাঁদের আটক ও নির্যাতনের জন্য
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়। চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।
পঞ্চম
অভিযোগে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া এবং সরকারের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়নকে
কৌশলে সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়। ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪-দলীয় জোটের
সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সপ্তম
অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। আর অষ্টম অভিযোগে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া
শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল
মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার
নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ৪০০
মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি
ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এখন
ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে ইনুর আপিলের পাশাপাশি সাজা বাড়ানোর আবেদনের ওপর উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে। আপিলের শুনানি ও নিষ্পত্তির মধ্য
দিয়ে মামলার পরবর্তী আইনি অগ্রগতি নির্ধারিত হবে।