বিরোধিতার নামে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে স্বৈরাচারী শক্তির পুনর্বাসনের বা দেশের রাজনীতিতে তাদের ফেরার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে তা হবে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের রক্তের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা বা গাদ্দারি—এমন দ্ব্যর্থহীন ও কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গণতান্ত্রিক ধারায় গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি পুরোনো ও ক্ষতিকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দেন।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) সকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জাতীয় ঐক্য এবং উন্নয়ন দর্শনের ওপর আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের ভূমিকা ও বিরোধী দলের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলের ভূমিকা পেয়েছে। সংসদে বা রাজপথে সরকারের সমালোচনা বা বিরোধিতা করা বিরোধী দলের স্বাভাবিক অধিকার, তবে সেই বিরোধিতা হতে হবে সম্পূর্ণ গঠনমূলক ও জনকল্যাণমুখী। শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করার পুরোনো ও অবহেলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে।
জাতীয় জীবনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার বা অন্যান্য নীতিগত ইস্যুতে ভিন্নমত বা নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থাকতেই পারে, তবে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসাসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোতে জাতীয় স্বার্থে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারি দল মানেই কেবল একুশ শতকের জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি নয় এবং বিরোধী দলই কেবল জনগণের কণ্ঠস্বর—এমন ভ্রান্ত ও সংকীর্ণ ধারণা থেকেও রাজনৈতিক দলগুলোকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকার আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দূরত্ব বা মতপার্থক্য ভুলে জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ তারা হাতছাড়া করেছেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। শহীদদের স্বপ্নের একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আবাসস্থলের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও অনেক বেশি যত্নবান ও সচেতন হতে হবে। প্রকৃতি ও গাছপালা ধ্বংস না করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, আনাস ও ওয়াসিম আকরামের বাবা-মাসহ অন্যান্য শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৯০ ফুট উঁচু ও এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন। এই স্মৃতিস্তম্ভে জুলাই অভ্যুত্থানের ৮৩৪ জন শহীদের নাম অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে খোদাই করা হয়েছে। পরে তিনি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।