ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,  ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্পিড গান ও ডোপ টেস্ট বন্ধ: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন ঠেকানো নিয়ে যা বললেন তাসনিম জারা টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা নিয়ে আজহারীর দীর্ঘ স্ট্যাটাস, সুশাসনের আহ্বান দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ নিহত ৭ গুলশানে কিংফিশারে মধ্যরাতের হানা: বিপুল অবৈধ মদ জব্দ মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক: ৯ মাসে শিকার ১০৯ শিশু পারমাণবিক অস্ত্র পেলেই ব্যবহার করবে ইরান, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি মাথাপিছু আয়ে ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: এলাকা ছাড়তে বহিরাগতদের কঠোর নির্দেশ

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক: ৯ মাসে শিকার ১০৯ শিশু


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ১১:০০ এএম

নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি তবে শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে? অভিভাবকদের পরম যত্নে গড়া স্বপ্নগুলো যখন কোনো অন্ধকার কোণায় বন্দি হয়, তখন পুরো সমাজের ভিত কেঁপে ওঠে। সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠনের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রমাণ করছে, পবিত্র মাদ্রাসার চারিত্রিক গণ্ডির ভেতরেই কোমলমতি শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের মাত্রা এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে, যা পুরো জাতিকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

 

মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২টি মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত ১০৯ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশে সন্তানকে বড় করার প্রত্যাশায় অভিভাবকেরা তাদের মাদ্রাসায় পাঠালেও সেখানে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। যদিও এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হচ্ছে, তবুও আইনি সুরক্ষার দুর্বলতা, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাব এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বহু ঘটনার বিচার অধরাই থেকে যাচ্ছে।

 

চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর বনশ্রীর একটি পরিচিত মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর রহস্যজনক ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তার মা মামলা দায়ের করার পর একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হলেও, প্রায় সাত মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই উসকে দিচ্ছে।

 

জেএমবিএফের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে সারা দেশে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব নৃশংস ঘণ্টায় মোট ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৭১ জন। এর মধ্যে ১৬১ জন নিষ্পাপ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার নির্মমতার মুখোমুখি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নথিভুক্ত এসব ঘটনার সিংহভাগই সংঘটিত হয়েছে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণের ভেতরে ও এর সংলগ্ন আবাসিক এলাকায়।

 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার সম্পন্ন করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়া। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান এ বিষয়ে জানান, ছেলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর শিশুর তাৎক্ষণিক শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ, যথাযথ সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুতের বিষয়ে আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট এসওপি বা স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এর ফলে মেডিকেল ও ডিএনএ পরীক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রমাণগুলো আইনসম্মত উপায়ে আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না, যা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পথে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করে।

 

অন্যদিকে, আমাদের সামাজিক কাঠামোর রক্ষণশীলতা এবং লোকলজ্জার ভয়ে ছেলে শিশুদের ওপর সংঘটিত বহু ঘৃণ্য অপরাধ এখনও পর্দার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী শিশুরা প্রয়োজনীয় জরুরি শারীরিক চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

 

এই ভয়াবহ সামাজিক সংকট নিরসনে কেবল কঠোর শাস্তির বিধান প্রণয়ন করে বসে থাকলেই চলবে না, বরং প্রতিরোধমূলক ও প্রায়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন অধিকারকর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম এ প্রসঙ্গে অভিমت ব্যক্ত করে বলেন, মাদ্রাসাসহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ বা ভালো-মন্দের স্পর্শ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে পারস্পরিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিং বা মানসিক পরামর্শের সুব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে শিশুরা যেকোনো ধরনের ভয়, হুমকি বা দ্বিধা ছাড়াই তাদের ওপর চলা নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অবসান ঘটানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 


এ সম্পর্কিত আরো খবর