মাথাপিছু
আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশ্ব
অর্থনীতিতে এক চমকপ্রদ তথ্য
উঠে এসেছে। বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির দেশ ভারতকে মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। জনসংখ্যার বিশাল ব্যবধান ও সার্বিক অর্থনীতির
আয়তনে ভারত বড় হলেও, মাথাপিছু
আড়ে-হ্বস্বের এই ব্যবধানে প্রতিবেশী
দেশকে টপকে যাওয়ার এই অর্জন বিশ্ববাসীর
নজর কেড়েছে।
আইএমএফের
সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়াতে পারে ২,৮৮৬ ডলারে।
অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে এই অঙ্কটি হবে
২,৭৪৯ ডলার। গত দুই দশকে
বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক
অগ্রগতির পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দেশের প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের
পোশাকশিল্প, প্রবাসী ভাই-বোনদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
তবে
এই সাফল্যের মুদ্রার পিঠে রয়েছে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ। সার্বিক
প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ভারত চলতি বছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির
আশা করলেও, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.৬ শতাংশে।
এছাড়া মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বিচারে ভারত বেশ কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাজার ও জীবনযাত্রার খরচ
বিবেচনায় ভারতের মানুষের জিনিসপত্র কেনার ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি বাংলাদেশে ৮.৭ শতাংশের
মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের ব্যবধানে ২০২৯ সালের দিকে ভারত মাথাপিছু আয়ে পুনরায় এগিয়ে যেতে পারে।
দুই
দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত বিন্যাসেও রয়েছে বড় ধরনের তফাত।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। এর বিপরীতে ভারত
অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তি, বিশাল সেবা খাত এবং এক বিশাল অভ্যন্তরীণ
বাজার ভিন্ন শক্তির জোগান দিচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের
বাণিজ্য পথ বন্ধ হওয়ায়
জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি
মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করায় এবং তৈরি পোশাকের চালানও এই পথেই প্রেরিত
হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
সবশেষে,
মাথাপিছু জিডিপির এই পরিসংখ্যান মূলত
একটি গড়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, যা সমাজের ভেতরের
প্রকৃত আয়বৈষম্য ও ধনী-দরিদ্রের
গভীর ব্যবধানকে ঢেকে রাখে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়
দেশেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও তার সুফল সমাজের সব মানুষের কাছে
সমানভাবে পৌঁছায়নি; বরং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। তাই এই পরিসংখ্যান যেমন
দারুণ এক সফলতার বার্তা
দেয়, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতে দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর কঠোর তাগিদও দেয়।
সূত্র:
আল-জাজিরা