ক্রীড়া প্রতিবেদক
লন্ডনের ঐতিহাসিক প্যালাডিয়াম থিয়েটার তখন যেন পুরো নিস্তব্ধ। কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ আটকে আছে মঞ্চের দিকে, যেখানে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো খাম থেকে টেনে বের করছেন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ীর নাম লেখা কাগজটি। সেই নাম ঘোষণার সাথে সাথেই চারদিক থেকে মুখরিত হয়ে ওঠে 'হ্যারি, হ্যারি' স্লোগানে। তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল এবং ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপের হৃদয় ভেঙে ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ও মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি নিজের করে নিয়েছেন ইংল্যান্ড ও বায়ার্ন মিউনিখের গোলমেশিন স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৫ বছরের অবসান ঘটিয়ে প্রথম কোনো ইংরেজ পুরুষ ফুটবলার হিসেবে এই অনন্য ও গৌরবময় সম্মান অর্জনের ইতিহাস গড়লেন তিনি।
মঞ্চে
কেইনের আবেগঘন অনুভূতি
বিশ্ব
ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের এই মুকুট মাথায়
পরে মঞ্চে উঠে নিজের বিস্ময় আর আবেগ ধরে
রাখতে পারেননি ইংলিশ অধিনায়ক। ট্রফিটি হাতে নিয়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, 'বাহ, বাহ, বাহ।' নিজের এই অবিশ্বাস্য প্রাপ্তির
মুহূর্তে প্রায় বাক্যহারা হয়ে পড়া কেইন বলেন, ‘আমি আজ ভাষা হারিয়ে
ফেলেছি। বিশেষ করে লন্ডনে এই জমকালো আয়োজনটি
হওয়ায় এটি আমার নিজের মাটির বুকে আরও বেশি বিশেষ অনুভূতি এনে দিয়েছে। আজকের এই রাতটি যেন
আমার জীবনের একটি অন্যতম শুভ সংকেত নিয়ে এলো। যারা আমাকে বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই। আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি, এ বছর পারফরম্যান্সের
বিচারে সেরা বেছে নেওয়া বিচারকদের জন্য নিশ্চয়ই বেশ কঠিন একটি কাজ ছিল।’ হলে উপস্থিত থাকা বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আজকের রাতে এই হলে অনেক
বিশ্বমানের খেলোয়াড় উপস্থিত আছেন। আজকের সমস্ত বিজয়ী ও মনোনীতদের অভিনন্দন।
জেদ এবং কঠোর পরিশ্রম যে সত্যি মানুষের
জীবনে সাফল্য এনে দিতে পারে, আজ সেটিই বিশ্বমঞ্চে
ফুটে উঠেছে।’
রেকর্ড
ও গোলের মহোৎসবে অনন্য কেইন
হ্যারি
কেইনের ব্যালন ডি’অর জয়ের
পেছনে রয়েছে তার অতিমানবীয় এক ফুটবল মৌসুম।
২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব
ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে প্রতিপক্ষের জালে মোট ৭৩টি গোল করেছেন এই গোলমেশিন। খেলোয়াড়দের
চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং নির্ধারণে বিচারকদের কেবল সাম্প্রতিক মৌসুমটিই বিবেচনায় নিতে বলা হলেও, ২০২৩ সাল থেকে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে কেইনের ধারাবাহিকতা ছিল অবিশ্বাস্য। জার্মান ক্লাবটির হয়ে ১৫৮টি ম্যাচে মাঠে নেমে চোখধাঁধানো ১৫৬টি গোল করেছেন তিনি, যা তাকে ইতিমধ্যে
বায়ার্ন মিউনিখের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় সপ্তম স্থানে তুলে এনেছে। শুধু তাই নয়, টানা তিন মৌসুম ধরে বুন্দেসলিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষ স্থানটি নিজের দখলে রেখেছেন তিনি। একই সাথে ২০২৫-২৬ মৌসুমে পুরো
ইউরোপের সার্বিক শীর্ষ ক্লাব গোলদাতাও ছিলেন এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড।
জাতীয়
দলের জার্সিতে অনবদ্য নেতৃত্ব
ক্লাব
ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের জাত চিনিয়েছেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডকে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে তাদের
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেছেন এই অধিনায়ক। তার
দূরদর্শী নেতৃত্বে ইংল্যান্ড তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্টে ব্রোঞ্জ মেডেল অর্জন করতে সক্ষম হয়। জাতীয় দলের হয়ে অসাধারণ পারফর্ম করার পাশাপাশি তিনি ওই আসরে পঞ্চম
সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে টুর্নামেন্ট শেষ করেন। মাঠে তার এই অলরাউন্ড নৈপুণ্য
ও অবিশ্বাস্য গোলক্ষুধাই শেষ পর্যন্ত তাকে ২০২৩ সালের পর বায়ার্ন মিউনিখকে
বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায়
নিয়ে গেছে এবং তার হাতে এনে দিয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মাননা 'সোনালী বল'।