ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,  ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এল নিনো ও যুদ্ধের প্রভাবে নতুন খাদ্যসংকটের সতর্কবার্তা বিশ্বব্যাংকের দেশের ৮ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা মামলায় হানিফসহ চারজনের রায় আজ স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা: ৬৮ জনের মৃত্যু, ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক সৌদিতে মাঝআকাশে উড়িয়ে দেওয়া হলো হুথিদের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রাইজবন্ডের ১২৫তম ড্র রোববার, প্রথম পুরস্কার ৬ লাখ টাকা জাপান সফরের তৃতীয় দিনে একাধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জাদুঘর ঘুরে দেখলেন জুবাইদা রহমান ইসরায়েলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট: সরকার গঠন নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা ইসরায়েল নির্বাচনে আরবদের চমক: কারচুপির অভিযোগে সরব লিকুদ পার্টি দিনে সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের নতুন সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?

দিনে সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের নতুন সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:০৮ এএম

নীলাভ জলরাশি আর প্রবালের অপরূপ সৌন্দর্যের দ্বীপ সেন্ট মার্টিন কি তবে আবারও চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে? প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করে এবার দৈনিক পর্যটক সাড়ে তিন হাজারে উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন করে উদ্বেগ দানা বেঁধেছে।


প্রাণপ্রকৃতি রক্ষায় এতদিন সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার কড়া বিধিমালা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যেতে পারবেন। একই সঙ্গে দ্বীপটিতে রাতযাপনের সুযোগ দুই মাস থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস করা হয়েছে। ফলে ১ নভেম্বর থেকেই সেখানে রাতে থাকা যাবে। প্রত্যেক পর্যটককে গুনতে হবে একশ টাকার পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে এসব তথ্য স্পষ্ট করেছে।


১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং বারবিকিউ করার ওপর রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কেয়াবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জারি করা হয়েছে নানা বিধিনিষেধ। তবে পর্যটক সংখ্যা একলাফে ৭৫ শতাংশ বাড়ানোয় এবং রাতযাপনের পরিধি দীর্ঘ করায় দ্বীপটির পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিবেশ কতখানি চাপ সইতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের মতে, আগের দুই হাজার পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামোই দ্বীপে গড়ে ওঠেনি। সেখানে অতিরিক্ত দেড় হাজার পর্যটক যুক্ত হলে ভঙ্গুর প্রাণপ্রকৃতি আরও ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে।


এর আগে ৫ আগস্টের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করেছিল। ওই তিন মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন মাত্র দুই হাজার পর্যটক দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ট্র্যাকের বেশি পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন, যা আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। এর ফলে দ্বীপটির পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণপ্রকৃতিতে চমৎকার সুফল পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি চলতি বছরের মে মাসে জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, পর্যটন বন্ধ থাকাকালীন সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা সামুদ্রিক পরিবেশের সুস্থতার পরিচায়ক।


তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হোটেল-রিসোর্ট ও জাহাজমালিকদের চাপে সরকার দৈনিক পর্যটক সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারে উন্নীত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পর্যটক বাড়ানোর বিষয়ে মন্তব্য জানতে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যস্ততার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি এবং সচিব ফাহমিদা খানম দেশের বাইরে থাকায় তাঁরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, দ্বীপের পরিবেশগত বহনক্ষমতা বিবেচনা করে দিনে এক হাজার থেকে বারোশো পর্যটক যাওয়া যুক্তিসংগত। সুপেয় পানির সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়িয়েই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পর্যটক বাড়ানোর আগে দ্বীপটি এই বাড়তি চাপ কতখানি নিতে পারবে, তার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা জরুরি ছিল। তিনি আরও বলেন, পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতিকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অতীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সীমা নির্ধারিত হলেও এবার রিসোর্টের মালিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রভাবে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশগত দিক বিবেচনায় পর্যটকের সংখ্যা কমানোর কথা থাকলেও তা বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি, পর্যটকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ১০০ টাকার তহবিল কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, সে বিষয়েও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।


সব মিলিয়ে, সেন্ট মার্টিনের দীর্ঘদিনের দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া পর্যটক বাড়ানো হলে তা দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপটির অস্তিত্বের জন্যই মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর