ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,  ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরেই মিলল সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার পরিচয় জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী তুরাগ নদ থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ মির্জাপুরে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, বিভিন্ন স্টেশনে আটকা একাধিক ট্রেন বঙ্গোপসাগরে জাপানের ‘বিগ-বি’ ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড অন্ধ্র প্রদেশ, নিহত ৫ কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআর পরিচালককে মারধর, কাঠগড়ায় ড্যাব ইনানীতে গভীর নলকূপের গর্ত থেকে দুই দিন ধরে জ্বলছে আগুন এল নিনো ও যুদ্ধের প্রভাবে নতুন খাদ্যসংকটের সতর্কবার্তা বিশ্বব্যাংকের

বঙ্গোপসাগরে জাপানের ‘বিগ-বি’ ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ১০:৫৬ এএম

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বঙ্গোপসাগর। বিশ্ব বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে। বিশেষ করে টোকিওতে অনুষ্ঠিত তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচি’র সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে জাপানের ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) উদ্যোগ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে জাপানের এই বিপুল আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ানোর এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে।

ঢাকা ও টোকিওর এই যৌথ মহাপরিকল্পনা কেবল সাধারণ বিনিয়োগ কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাতারবাড়ী ও মহেশখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত লজিস্টিকস, জ্বালানি এবং শিল্প হাব গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ (মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক) নীতি মূলত এই অঞ্চলের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার সুরক্ষাকবচ।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই মহাপরিকল্পনায় চালকের আসনে বসার সুযোগ রয়েছে ঢাকার। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান জানান, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাথায় অবস্থান করছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে বিবেচনা করলে এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। আমরা যদি এই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলেই কেবল জাপানের এই ইতিবাচক মনোভাব এবং মহাপরিকল্পনা থেকে দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ সুফল আদায় করা সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. রহমত উল্লাহ মনে করেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এবং বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার যে উদ্যোগ বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সেটির পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা সময়ের দাবি।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ঠিক পিঠেই রয়েছে তীব্র ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে ঢাকাকে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে হবে। একদিকে যেমন বঙ্গোপসাগরে চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। এই দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মাঝে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর নানা ধরনের স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ এর কেন্দ্রে রয়েছে, তাই বাংলাদেশকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কীভাবে বঙ্গোপসাগরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি করা যায়, সেটিই হবে মূল কৌশল।

ড. রহমত উল্লাহর মতে, বাংলাদেশ যদি এই স্পর্শকাতর বিষয়টি চরম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিবেচনা করে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখে, তবেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

মূলত, ‘বিগ-বি’র সাফল্য কেবল বড় বড় অবকাঠামো বা বন্দর নির্মাণের ওপর নির্ভর করছে না। এটি আসলে জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। অর্থনৈতিক এই মহাসম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর