পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনার পারদ এবার আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেল। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশসীমা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সর্বাধুনিক ‘স্পাই ড্রোন’ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মাটিতে নামিয়ে এনেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। দীর্ঘদিনের বৈরী অবস্থান ও সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের জের ধরে ড্রোন আটকের এই বড় ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন করে বড় ধরণের তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) কৌশলগত কৌশল প্রয়োগ করে চালকহীন এই আমেরিকান নজরদারি বিমানটি আটক করা হয়। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিট ড্রোনটিকে নিরাপদে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে মাটিতে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়। এই সফল অভিযানের পর সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুরো ঘটনার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হয়।
আইআরজিসির ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিটের দেওয়া বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, “আমাদের সুশিক্ষিত ও সতর্ক যোদ্ধারা হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাঞ্চলে আমেরিকান সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীর একটি 'এমকিউএম-১৭০' (MQM-170) মডেলের স্পাই ড্রোন নিরাপদভাবে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।” ওই বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, আটককৃত মার্কিন এই স্পাই ড্রোনের মূল গোপন উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগর এবং সমগ্র হরমুজ প্রণালি এলাকায় মোতায়েন থাকা ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিখুঁত অবস্থান ও সংবেদনশীল তথ্য শনাক্ত করা।
ড্রোনটি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইরানের সামরিক বাহিনীর নৌ বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন। আইআরজিসির নৌ বিশেষজ্ঞরা ড্রোনটির মেমোরি ও অভ্যন্তরীণ তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছেন যে, ড্রোনটি পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী কোনো একটি দেশের সামরিক ঘাঁটি থেকে আকাশে ওড়ানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, এর আগেও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি 'এমকিউ-১' (MQ-1) মডেলের শক্তিশালী সামরিক ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছিল।
এই নতুন ড্রোন আটকের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন পুরো হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে চরম সামরিক থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্থানে সামরিক হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সেখান দিয়ে বিশাকায় জ্বালানিবাহী তেলট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারছে না।
এদিকে ড্রোন আটকের খবর প্রকাশের পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীকে একটি শক্ত বার্তা পুনঃব্যক্ত করা হয়েছে। দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ নতুন করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তাদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি সম্পূর্ণরূপে পূরণ ও বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি শিপিং চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।