রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আলোচিত এই ঘটনায় নৌ পুলিশের পাশাপাশি ছায়াতদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এরই মধ্যে অকুস্থলের কাছাকাছি এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই বাহনটি নিহত তাহসিফের কি না, তা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তদন্ত সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাহসিফের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়। নিখোঁজের আগে তাহসিফ ও দ্বীপ দীর্ঘ সময় একসঙ্গে অবস্থান করেছিলেন। তারা ঠিক কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের শেষ গতিবিধি ঠিক কী ছিল—দ্বীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ মে মেলানো হচ্ছে। তবে দ্বীপকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পিবিআই এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
অন্যদিকে, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজারবস্তি এলাকা থেকে উদ্ধার করা ওই মোটরসাইকেলটিকে কেন্দ্র করে তদন্ত নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। নৌ পুলিশ মূল মামলার তদন্ত পরিচালনা করলেও পিবিআই এবং পুলিশের অন্যান্য বিশেষ ইউনিট কারিগরি সহায়তা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলের সঠিক মালিকানা নিশ্চিত হওয়া গেলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তে নদীর ঘাটে পৌঁছানোর পেছনে রহস্যের একটি বড় ক্লু উন্মোচিত হবে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নিজস্ব বাসভবন থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এর ঠিক আগে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ তাঁর বাসায় যান। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের দুজনকে আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে বের হতে দেখা যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দ্বীপের আহ্বানে সাড়া দিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ, কিন্তু এরপর থেকে আর তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে ভেসে থাকা মরদেহটি উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ। পরবর্তীতে নিহতের হাতের ঘড়ি এবং পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা তাঁর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করেন। পরদিন মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর আসল কারণ নিয়ে তদন্তকারীদের মাঝে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের শরীরে সরাসরি আঘাতের কোনো চিহ্ন না থাকলেও নাক দিয়ে রক্ত ঝরা এবং পেট ফোলা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
উল্লেখ্য, কে এম তাহসিফ সৌরি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিশেষ দৃশ্য ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের প্রেক্ষাপটে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পুরো ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা—তা জানতে তদন্ত কাজ অব্যাহত রয়েছে।