ঋণের
যাতাকলে পিষ্ট হয়ে এক অভাগা
মায়ের চরম সিদ্ধান্তের করুণ
পরিণতি দেখল দেশবাসী। বরগুনার
একটি ডাকবাংলোর দুটি আলাদা কক্ষ
থেকে মা ও তার
দুই কোমলমতি শিশুর মরদেহ উদ্ধারের রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্তে
বেরিয়ে এসেছে এক মর্মান্তিক ও
হৃদয়বিদারক সত্য—বিভিন্ন এনজিও
এবং স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে নেওয়া
চার লক্ষাধিক টাকার ঋণের বোঝা মাথায়
নিয়ে তীব্র মানসিক অবসাদ ও হতাশার বশে
প্রথমে দুই মেয়েকে হত্যা
করেন মা ইতি রানী
এবং পরবর্তীতে নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নেন।
গত
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে
বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক বিশেষ সংবাদ
সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য
গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন অতিরিক্ত
পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো.
মুকিত হাসান খাঁন।
পুলিশের
করা বিস্তারিত তদন্ত সূত্রে জানা যায়, প্রায়
১৫ বছর পূর্বে বরগুনা
পৌরসভার কড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন ইতি রানী। দাম্পত্য
জীবনের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায়
তাদের ঘরে জন্ম নেয়
দুটি কন্যা সন্তান। স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় একজন সাধারণ দর্জি
ছিলেন এবং পাশাপাশি ক্ষুদ্র
পরিসরে সুপারির ব্যবসা করতেন। কিন্তু সীমিত উপার্জনের সেই অর্থে তাদের
নিত্যদিনের সংসার খরচ এবং অভাব-অনটন মেটানো কোনোভাবেই
সম্ভব হচ্ছিল না। স্বামীর ব্যবসায়
আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং সংসারের অসচ্ছলতা
দূর করার আশায় ইতি
রানী স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও থেকে
একে একে মোট ২
লাখ ২৭ হাজার ৭২৩
টাকা ঋণ গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসও আরেকটি এনজিও এবং স্থানীয় পৃথক
দুই ব্যক্তির কাছ থেকে আরও
১ লাখ ৮০ হাজার
টাকা ধার নেন। সবমিলিয়ে
স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ
মাথায় মোট ৪ লাখ
৭ হাজার ৭২৩ টাকার ভারী
ঋণের পাহাড় জমে যায়।
তদন্তে
আরও জানা যায়, বিভিন্ন
এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের
সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি
সময়মতো পরিশোধ করার পরও ঋণের
সম্পূর্ণ টাকা কীভাবে পরিশোধ
করা সম্ভব হবে—এই গভীর
ভাবনা ও মানসিক দুশ্চিন্তায়
দিনদিন তীব্র হতাশার শিকার হন ইতি রানী।
স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসারে সচ্ছলতা
আনতে এবং ঋণের চাপ
কিছুটা কমাতে তিনি বাধ্য হয়ে
জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরি নেন। ঘটনার মাত্র
দুই মাস আগে তিনি
এই কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
কিন্তু পাহাড়সমান ঋণের দায় ও
দুশ্চিন্তা তাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ
ভেঙে ফেলেছিল।
উল্লেখ্য,
গত ৩ জুন বেলা
১১টার দিকে দুই মেয়েকে
সঙ্গে নিয়ে ইতি রানী ডাকবাংলোতে
প্রবেশ করেন। দুপুরের দিকে ডাকবাংলোর তৃতীয়
তলার একটি কক্ষের দরজা
ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ
দেখে সহকর্মীদের সন্দেহ হয় এবং তারা
পুলিশে খবর দেন। পুলিশ
দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে একটি কক্ষ থেকে
বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস এবং অন্য একটি
বন্ধ কক্ষের ভেতর থেকে মা
ইতি রানী ও ছোট
মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের নিথর মরদেহ উদ্ধার
করে। একই সঙ্গে মা
ও দুই মেয়ের রহস্যজনক
মৃত্যুর এই ঘটনাটি পুরো
এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি
করে। পরবর্তীতে গত ৯ জুন
নিহত ইতি রানীর স্বামী
দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা
ব্যক্তিদের আসামি করে বরগুনা থানায়
একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ
সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো.
মুকিত হাসান খাঁন সংবাদ সম্মেলনে
আরও জানান, নিহত ইতি রানীর
স্বামীর কোনো নিজস্ব জমি
বা পুত্রসন্তান ছিল না। স্বামীর
চরম আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং বিপুল ঋণের
বোঝা বইতে না পেরে
মানসিক হতাশা থেকে মা নিজেই
এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন বলে প্রাথমিক
তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং খুব দ্রুতই
আদালতে চার্জশিট বা পুলিশ প্রতিবেদন
দাখিল করা হবে।